শিশু ছাত্রকে ১০ মাদ্রাসা শিক্ষক-ছাত্রের ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার নেই

ঢাকার সাভারে মাদ্রাসার শিশু ছাত্রকে ১০ ছাত্র ও শিক্ষকের ধর্ষণের মামলার আট দিন পর মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ নামে সেই মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়েছে সাভার মডেল থানা পুলিশ। তবে অভিযানে মামলার ১০ আসামির কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টম্বর) দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে উপজেলার পূর্ব শাহীবাগ এলাকায় মাদ্রাসাটিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

পুলিশ জানায়, সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি অপারেশন) আব্দুস সবুরের নেতৃত্বে পুলিশের দুটি টিম মাদ্রাসায় যায়। মাদ্রাসার মক্তব শাখায় শিক্ষার্থী ও উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন ও অভিযোগ ওঠা ছাত্রদের নথিপত্র যাচাই করেন। শিক্ষকদের বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এ সময় অভিযুক্ত ছাত্র ও শিক্ষকরা পলাতক রয়েছেন বলে সেখানে উপস্থিতরা জানান। দীর্ঘ সময় সেখানে উপস্থিত শেষে তারা ফিরে আসেন।

তাৎক্ষণিক অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা ঘটনার বিষয়ে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ কথা বলবেন জানিয়ে অভিযানের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে বিকেলে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপারেশন ট্রাফিক উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “প্রথমে ভিক্টিমের পরিবার আমাদের থানায় আসেনি, এই বিষয়টি আপনাদের স্পষ্ট করা দরকার। ভিক্টিমের পরিবার আদালতে বিষয়টি নিয়ে যান, আদালতের নির্দেশে সাভার মডেল থানায় মামলাটি রুজু করি। এরপর আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য আমাদের একাধিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করি। আজ আসামিদের পাওয়া যায়নি, তারা পলাতক রয়েছে। খুব দ্রুত আমরা তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব।”

এদিকে, পুলিশের অভিযানে এখনও আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় মামলার বাদী ভুক্তভোগী শিশুর বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমার ছেলেকে দীর্ঘ ছয় মাস ৬-৭ জন ছাত্র ও শিক্ষক মিলে ধর্ষণ করেছে। আমার ছেলে অসুস্থ। দীর্ঘ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও পুলিশ একজন আসামিও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। পুলিশ শুরুতেই অভিযান চালালে সব আসামি গ্রেপ্তার করতে পারতো। পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে এমনও বলা হয়েছে, মামলার একজন আসামি সাদপন্থী নেতা হওয়ায় ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালানো যাবে না। চালালে উল্টো থানায় আক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘ দিন পরে হলেও পুলিশ আজ মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়েছে। কাউকে আটক করতে পারেনি। পুলিশের কাছে আমার দাবি, অতি দ্রুত মামলার সব আসামি গ্রেপ্তার করা হোক ও আইনের আওতায় আনা হোক।”

যা বললেন মাদ্রাসা ছাত্র ও কর্তৃপক্ষ

মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ঘটনায় আমরা প্রকৃত দোষীর যথাযথ বিচার চাই। তবে আমাদের দাবি, উদ্যেশ্য প্রণোদিত হয়ে কোনো ছাত্র ও শিক্ষককে যেন হয়রানি না করা হয়। তবে যেসব ছাত্রের নাম মামলায় দেওয়া হয়েছে প্রত্যেকের বয়স ১৩ ও এর নিচে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

মাদ্রাসাটির বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও হিসাব রক্ষক লোকমান বলেন, “ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা আমাদের সঙ্গে তাবলিগ জামাত করতেন। ১০-১২ দিন আগে তিনি আমাদের এখানে এসে হাঁকডাক করে হুজুরকে (মোহতামিম) ডাকতে থাকেন। হুজুর নিচে এসে দেখতে পান তিনি তাকে গালিগালাজ করছেন, তার হাতে দেশীয় অস্ত্র। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের সঙ্গে এ ধরনের খারাপ কাজ হয়েছে। যারা করেছে, যে হুজুররা করেছে, আমি তাদের জবাই দেব।’ এতে হুজুর বিব্রত হন। পরবর্তীতে যে ওস্তাদ এবং যে ছাত্রদের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা ভয়ে সেদিনই মাদ্রাসা ছেড়ে চলে যায়।”

তিনি বলেন, “বড় হুজুর একজন মাদ্রাসার প্রধান, আমাদের তাবলিগের মুরব্বি। তিনি আন্তর্জাতিক একজন ব্যক্তিত্বও। তিনি বিষয়টির বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন সেদিনই। আমাদের বক্তব্য, কেউ যদি অন্যায়-অপরাধ করে থাকে, তাহলে তদন্ত করা হোক। তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হোক। কেউ যদি এ ধরনের কাজ করে থাকে, তার পরীক্ষা করা হোক, তার আলামত পরীক্ষা করা হোক।”

লোকমান বলেন, “আমরা তাবলিগের সাথী হিসেবে শিক্ষার্থীর বাবার সঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে একটা সমাধান করতে চেয়েছিলাম। কয়েকবার তার সঙ্গে বসে কীভাবে বিষয়টি সমাধান করা যায়, তা নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু তিনি বিষয়টি সেভাবে গ্রহণ করেননি।”

এর আগে, সাত বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় মাদ্রাসার ছয় শিক্ষার্থী ও চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেন ভুক্তভোগীর বাবা। মামলায় পাঁচ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। বাকি চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতা, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করা, ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ২৬ আগস্ট সাভার মডেল থানায় মামলাটি রুজু করে।