চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী সরফভাটা এলাকায় ‘কর্ণফুলী পানি শোধনাগারের তৃতীয় প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।
‘কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-৩’ নামের এ প্রকল্প থেকে প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা- জাইকা।
ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নগরীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়ণের কারণে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে। বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পুরোনো সরবরাহ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই চাপ সামলানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী পানি শোধনাগারে অতিরিক্ত ১০ কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য জাইকার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেছেন, “কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-৩ এ অর্থায়নে সম্মত হয়েছে জাইকা। তাদের একটি প্রতিনিধিদল এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজও খুব দ্রুত শুরু করবে। এজন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”
তিনি বলেন, “নতুন শোধনাগারটির অন্যতম সুবিধা হচ্ছে এ প্রকল্পের পানি চট্টগ্রাম নগরীতে সরবরাহের জন্য নতুন করে কোনো আলাদা পাইপলাইন স্থাপনের প্রয়োজন হবে না। কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-২-এর বিদ্যমান পাইপলাইন ব্যবহার করেই পরিশোধিত পানি চট্টগ্রাম নগরীতে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।”
ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প-৩ রাঙ্গুনিয়ার গোডাউন ব্রিজসংলগ্ন সরফভাটা এলাকায় বাস্তবায়ন করা হবে। একই এলাকায় বর্তমানে কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-২-এর কার্যক্রম রয়েছে। নতুন প্রকল্পের জন্য জাইকার একটি প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে সম্ভাব্য এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং প্রকল্পের প্রাক ফিজিবিলিটি স্টাডি কার্যক্রম সম্পন্ন হলে সম্ভাব্যতা যাচাই কাজ পুরোদমে শুরু হবে। এরপর জানা যাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কত টাকা ব্যয় হবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম জানান, এর আগে ২০১৬ সালে জাইকা রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার গোডাউন এলাকায় দৈনিক ১৪ কোটি ৩০ লাখ লিটার পানি উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-২ এ অর্থায়ন করেছিল।
এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ৪৯১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকা ৩ হাজার ৬২৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সরকার ৮৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং চট্টগ্রাম ওয়াসা ২৩ কোটি ৭ লাখ টাকা অর্থায়ন করেছিল।
২০২১ সালের ১৬ মার্চ থেকে রাঙ্গুনিয়ার গোডাউন এলাকায় কর্ণফুলী নদী থেকে এই প্রকল্পের পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের পর পাইপ লাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরীর নাসিরাবাদে রিজার্ভার এবং হালিশহরে এলিভেটেড ট্যাংকের মাধ্যমে গ্রাহকদের মধ্যে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এর এক বছর পর ২০২২ সালের ১৬ মার্চ এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
রাঙ্গুনিয়ায় বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসার দুটি প্রকল্প রয়েছে। একটি কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-১ এবং দ্বিতীয়টি কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-২।
কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-১ এর পানি উৎপাদন হচ্ছে রাঙ্গুনিয়ার পোমরা ইউনিয়নের শান্তিরহাট এলাকায় কর্ণফুলী নদী থেকে। আর কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-২ এর পানি উত্তোলন হচ্ছে রাঙ্গুনিয়ার গোডাউনস্থ সরফভাটা এলাকা থেকে। আর কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-৩ এর পানিও উত্তোলন হবে সরফভাটা কর্ণফুলী নদী থেকে।
প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম আরও জানান, কর্ণফুলী পানিশোধনাগার প্রকল্পের আওতায় রাঙ্গুনিয়ায় স্থাপিত ফেইস-১ ও ফেইস-২ শোধনাগার ২টি ওয়াসার মেঘা প্রকল্প। শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দুরে এগুলোর অবস্থান। কর্ণফুলী নদী থেকে পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের পর পাইপ লাইনের মাধ্যমে নগরীতে গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়।
এই ২টি প্রকল্প থেকে বর্তমানে দৈনিক ২৮ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি উৎপাদন করা হচ্ছে। এর জন্য কর্ণফুলী নদী থেকে দৈনিক ৩০ কোটি লিটার পানি তোলা হচ্ছে। আগে সিস্টেম লস ছিল ৩৩%। বর্তমানে তা কমিয়ে ২০%-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।
মাকসুদ আলম বলেন, “আমরা চেষ্ঠা করছি সিস্টেম লস আরো কমানোর জন্য। সিস্টেম লস কমাতে পারলে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ আরো বাড়বে। তবে ওয়াসা মূলত একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। আমাদের মূল কাজ হচ্ছে সেবা ঠিকমতো দিতে পারছি কিনা। তবে আমরা যথাযথ সেবা দিয়ে ভালো পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পেরেছি যা থেকে খরচ মেটানোর পরও লোন পরিশোধ করে ওয়াসার ফান্ডে টাকা জমা হচ্ছে।”