রংপুরের নারী-শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ঝুলছে ৬ হাজার মামলা 

রংপুরের তিনটি নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৬ হাজারের অধিক মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। ৫ থেকে ১৮ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন বিচার প্রত্যাশি নির্যাতিত নারীরা। এর মধ্যে ২ হাজারেরও বেশী মামলা হচ্ছে ধর্ষনের। আর ৩০০ বেশী মামলা ৫ থেকে ১৮ বছর ধরে বিচারই শুরু হয়নি। 

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিচার সম্পন্ন না হবার বিষয়টিকে আইনের সঠিক প্রয়োগ আর আদালতে সাক্ষী হাজির করার ব্যাপারে পুলিশের দায়িত্বহীনতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনাকারীদের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করছেন মানবাধিকার নেত্রী, আইন বিশেষজ্ঞ ও বিচার প্রত্যাশিরা। 

সরেজমিন নারী ও শিশু আদালত ঘুরে দেখা যায়, নারী ও নির্যাতন আদালত-২ এর সামনে বসে কান্না করছেন রংপুরের পীরগাছা উপজেলার অনন্দানগর গ্রামের শরীফা ইয়াসমিন। কারণ, ২ লাখ টাকা যৌতুক দিতে পারেননি বলে তার স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। তিনি যৌতুক আইনে মামলা করার পর ৬ বছর ধরে আদালতে আসছেন কিন্তু বিচারই শুরু হয়নি। 

কবে বিচার পাবেন জানেন না এই ভুক্তভোগী। ২ মাস পর পর মামলার তারিখের দিন উকিল মহুরির হাজিরাসহ কাগজ কেনা পেশকারের খরচ জোগাতে গিয়ে গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগী বিক্রি করে ফেলেছেন তিনি। 

একই অভিযোগ পীরগঞ্জের আসমা বেগম, রংপুর সদরের মরিয়ম বেগমসহ অনেকের। বেশিরভাগই ধর্ষণের মামলা ৬ থেকে ১৮ বছর ধরে বিচারকাজ শেষ হচ্ছে না। 

তাদের অভিযোগ সহায় সম্বল যা ছিলো বিক্রি করে প্রতি তারিখে আদালতে আসেন উকিল, মহুরি পেশকারকে টাকা দেন আর বাড়ি ফিরে যান। 

মিঠাপুকুর উপজেলার হতদরিদ্র আসমা বেগম জানালেন তার মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করার মামলা ৮ বছরেও বিচার শুরু হয়নি। 

পীরগঞ্জ উপজেলার ভেন্ডাবাড়ি গ্রামের সোহরাব হোসেন অভিযোগ করেন ১৮ বছর ধরে আদালতে ঘুরছেন তার বিরুদ্ধে ধর্ষনের একটি মামলায়। তিনি জানান, মামলার ধার্য তারিখে না আসলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। বাধ্য হয়ে ঢাকা থেকে রংপুরে আদালতে আসেন আবার হাজিরা দিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে যান পেশায় এই রিকশা চালক। 

রংপুর জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি রুমানা জামান অভিযোগ করে বলেন, ‘‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলা নির্দিষ্ট টাইমফ্রেমে বেঁধে দেয়া থাকলেও মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বিচারপ্রার্থীরা আদালতের বারান্দায় আসছেন আর ফিরে যাচ্ছেন।’’ 

নারী নেত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘‘রংপুরে নারী নির্যাতন মামলাগুলোর বিচার না হওয়া এবং অপরাধীরা শাস্তির আওতায় না আসায় নারী নির্যাতন ধর্ষণ যৌতুকের ঘটনা দিনদিন বাড়তেই আছে। এ জন্য প্রয়োজন বিচারকের সংখ্যা আরও বাড়ানো এবং দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা।’’ 

নারী ও শিশু নির্যাতন আদালত-১ এর বিশেষ পিপি শফি কামাল জানান, এই আদালতে প্রায় ২ হাজার মামলা বিচারের অপেক্ষায় আছে। মামলার তারিখে সাক্ষী আসেনা আবার মামলার বাদী ঠিক মতো আদালতে আসেনা, এসব কারণে মামলার জট বৃদ্ধিসহ নানান সমস্যা হচ্ছে। তবে বিচারক ও তারা চেষ্টা করছে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায় বিচার প্রদান করতে। 

একই কথা বলেন নারী ও শিশু নির্যাতন আদালত-২ এর বিশেষ পিপি মোকসেদুল হক।  

এদিকে, আইন বিশেষজ্ঞরা নারী নির্যাতন মামলার বিচার দ্রুত নিস্পত্তি করার জন্য আলাদা সেল গঠন করার দাবি জানান।