বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে মনোনয়ন দিয়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক কমিশনার, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং মুক্তিযোদ্ধা সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছে বলে রবিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সাংবাদিকদের জানান দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটি মনোনীত প্রার্থী সাহাবুদ্দিন চুপ্পু দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হচ্ছেন বলে নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায়।
সংসদে ৩৫০ আসনের মধ্যে ৩০২টি আসনই আওয়ামী লীগের।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পু'র শিক্ষাজীবন
সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ১৯৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন।অল্প বয়সেই রাজনীতির সঙ্গে জাড়ানো সাহাবুদ্দিন চুপ্প ‘র ছাত্ররাজনীতির ক্যারিয়ার ছিল বর্ণাঢ্য।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এরপর একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৭৫ সালে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।
রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পাবনার বাসিন্দা সাহাবুদ্দিন চুপ্পু রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
সত্তরের দশকে পাবনা জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্রনেতা হিসেবে উত্তরাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। এ সময় তিনি স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের পাশাপাশি পাবনা জেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পু মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি আবার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর নবগঠিত সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় গ্রেপ্তার হয়ে তিন বছর কারাগারে ছিলেন তিনি।
কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ভারতে যান সেখানে অবস্থান করা তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে।
১৯৮২ সালে বিসিএস (বিচার) ক্যাডার হিসেবে যোগ দেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। সে সময় তিনি পাবনা জেলা শাখা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের পদেও ছিলেন।
তিনি সবসময় তার পেশার প্রতি নিবেদিত ছিলেন। ১৯৯৫ সালে তিনি জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় তাকে আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতা-কর্মীদের দ্বারা হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের তদন্তের জন্য গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বিচারকের বিভিন্ন পদে ২৫ বছরের কর্মজীবন শেষে ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন তিনি।
২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সেখানে থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি আবারও সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ২০২০ সালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন।
তিনি আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটিরও চেয়ারম্যান।২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা প্রয়াত এইচ টি ইমাম মারা গেলে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে মনোনয়ন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জেএমসি বিল্ডার্স লিমিটেডের পরিচালনা বোর্ডেও রয়েছেন।এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক লিমিটেডের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ১৯৮০-১৯৮২ সাল পর্যন্ত দৈনিক বাংলার বাণীতে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন।
তিনি দেশের বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত।
তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। জুডিশিয়াল ট্রেনিং একাডেমি আয়োজিত কেস ম্যানেজমেন্ট, কোর্ট ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক অনেক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা-সম্মেলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন তিনি।
তিনি চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে কমনওয়েলথ আয়োজিত বাংলাদেশে প্রচলিত আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন।
ব্যক্তিজীবন
তিনি ব্যক্তিগত জীবনে এক ছেলে সন্তানের জনক এবং তার স্ত্রী অধ্যাপক ড. রেবেকা সুলতানা সরকারের সাবেক যুগ্ম সচিব ছিলেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে সক্রিয়ভাবে তার মতামত প্রকাশ করছেন এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে নিবন্ধ লিখছেন। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও তিনি বেশ সক্রিয়।