সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলের শেষ দিকে নতুন উত্তাপ নিয়ে হাজির হয়েছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা “খবরের কাগজ”। এই সাপ্তাহিকীর নতুন উদ্যোক্তা তখন এক স্বপ্নে বিভোর। এই স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়া এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া মুক্তির গল্প। যে গল্প ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা লাভের। যে গল্প ছিল হাজার বছরের বাঙালির কাঙ্ক্ষিত মুক্তির, ‘জয় বাংলা’র।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির জনকের হত্যার পর থেকে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে এই গল্প ছিল অচেনা। হারিয়ে যাওয়া সেই মুক্তি আর “জয় বাংলা”কে সাড়ম্বরে ফিরিয়ে এনেছিলেন কাজী শাহেদ আহমেদ।
সোমবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় প্রয়াত হন তিনি। কাজী শাহেদ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে প্রথম মামলা করেছিলেন। নিজের আপন ছোট ভাইকে হত্যার দায়ে একাত্তরে পাকিস্তানের দোসর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যশোরে মামলা করেছিলেন তিনি।
১৯৯৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর যশোর জজকোর্টে নিজের বিশ বছরের ছোটভাই কাজী মঈনুল হাসানকে হত্যার জন্য গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে মামলা করেন। সেদিন তার সঙ্গে ঢাকা থেকে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও যশোরের টিপু সুলতান ছিলেন।
স্থানীয়রা জানান, সেদিন মিছিলসহ জজকোর্টে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা করেন কাজী শাহেদ আহমেদ।
এই মামলা করার পরিস্থিতিও খুব সহজে ধরা দেয়নি কাজী শাহেদ আহমেদের কাছে। সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, দৈনিক আজকের কাগজ প্রকাশের মধ্য দিয়ে দেশে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে নতুন করে যে উজ্জীবনী সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সাহসেই তিনি ১৯৯৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে মামলা করার মনস্থির করেন।
কাজী শাহেদ আহমেদের আত্মজীবনী “জীবনের শিলালিলিপি’তে তিনি লিখছেন, “এ অবস্থায় একদিন ঠিক করে ফেললাম, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মামলাটা আমি নিজেই করবো। আমার এ মামলা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে হবে। মামলাটি কোথায় করবো এবং কেন করবো? যশোরে করবো কারণ সেখানেই আমার ভাই কাজী মঈনুল হাসানকে হত্যা করা হয়েছিল এবং সে হত্যার জন্য গোলাম আযম দায়ী।”
এ বিষয়ে যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী ফরিদুল ইসলাম বলেন, “যতদূর মনে পড়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রথম দাবি তার প্রকাশিত দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকায় উঠে এসেছিল। তারও আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলাটি যশোরে হয়েছিল। কাজী শাহেদ আহমেদের ছোট ভাই মঈন সাহেব ১৯৭১ সালে শহীদ হয়েছিলন। ওই ঘটনায় যশোর আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করেছেন কাজী শাহেদ আহমেদ।”
তিনি বলেন, “সেই মামলার আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামসহ আরও কয়েকজন। ওই মামলার পথ ধরেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কাজ শুরু হয়। সেই বিচারে বাংলাদেশে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। এর সব কৃতিত্ব কাজী শাহেদ আহমেদের। তার মৃত্যু আমাদের পথপ্রদর্শক শূন্য করেছে। গভীর শোক জ্ঞাপন করছি।”
মামলা করার আগে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়ে “জীবনের শিলালিলিপি”তে কাজী শাহেদ লিখেছেন, “আমি এই প্রস্তাবনা নিয়ে প্রথমে গেলাম শেখ হাসিনার কাছে তার সম্মতি জানার জন্য। উনি আমার কথাগুলো অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে শুনলেন। এ সময় তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তবে তিনি মামলার কথায় খুবই খুশি হলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে গেলাম খালেদা জিয়ার কাছে। তাকেও পুরো ঘটনাটা বললাম। তিনি আমার কথা শুনে শুধু বললেন, ‘এটা আপনার অধিকার। আপনি মামলা করতেই পারেন’।”
গ্রন্থে শাহেদ আহমেদ আরও উল্লেখ করেন, “আমার যা বোঝার তা বুঝে গেলাম। তারপর গেলাম জেনারেল নাসিমের কাছে। তিনি তখন ডিজিএফআই প্রধান। তাকে পুরো ঘটনা বলা হলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি আমাকে স্যালুট করে বললেন, ‘শাহেদ ভাই, কাজটা তো কাউকে না কাউকে করতে হতো। আপনিই করেন।”
“এরপর আমার শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। জেনারেল নাসিমের কাছ থেকে চলে এসে যশোর যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলাম।”
ওই মামলা নিয়ে শাহেদ আহমেদকে স্থানীয় পুলিশ থেকে জানানো হয়েছিল, তারা কোনো সাক্ষী-সাবুদ পাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে ২০১৪ সালে প্রকাশিত “জীবনের শিলালিলিপি”তে শাহেদ আহমেদ বলেন, “আমি তাতে বিন্দুমাত্র পরোয়া করি না। কাজ যেটা করার তা করে ফেলেছি। সেই ঘটনার দুই দশক পর শেখ হাসিনার সরকারই এ দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে এবং তা চলমান আছে। রায় বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রতিটি গর্বিত বাঙালির মতো আমার জন্যই এটা বিশাল একটা পাওয়া।”
ফিরে আসে ‘জয় বাংলা’
বাংলা, বাঙালিত্ব আর মুক্তিযুদ্ধকে তিনি মনেপ্রাণে আপন করে ভাবতেন। সেই বিষয়টিই তার “জীবনের শিলালিপি”তে পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, “আমার অনেক দিনের ইচ্ছা পত্রিকায় আবার ‘জাতির পিতা’, ‘বঙ্গবন্ধু’, আর ‘বাঙালী’-এই শব্দগুলো নিয়মিত ছাপা হবে। নতুন প্রজন্ম জানবে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লেখা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে লেখা হবে। মানে ম্রিয়মাণ মুক্তিযোদ্ধাদের আবার জাগাতে হবে। বিপ্লব ঘটাতে হবে, ১৬ ডিসেম্বর আবার ফেরত আনতে হবে।”
১৯৮৮ সালে সাংবাদিক নাইমুল ইসলাম খান সম্পাদিত সাপ্তাহিক খবরের কাগজ বের করার পর কাজী শাহেদ আহমেদকে প্রকাশনার দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেন। এরপর কাজী শাহেদ পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাপ্তাহিকীর কার্যালয় করেন নিজের ব্যবসায়িক অফিসে।
খবরের কাগজ যখন পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখনই সামরিক শাসক এরশাদের তোপের মুখে পড়ে পত্রিকাটি। করা হয় নিষিদ্ধ। যদিও তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের রায়ে রাহুগ্রাস মুক্ত হয় খবরের কাগজ।
১৯৯০ সালের ২৫ অক্টোবর খবরের কাগজের সংখ্যায় বের হলো “জয় বাংলা”। প্রচ্ছদে লেখা ছিল, “জয় বাংলা” বাঙালির জাতীয় স্লোগান। এই স্লোগানের কোনোরকম পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন তথা বিকৃতিকরণ একটি ক্ষমহীন জাতীয় অপরাধ।
কাজী শাহেদ আহমেদ তার আত্মজীবনীতে লেখেন, “এই সংখ্যার খবরের কাগজ পুরো জাতিকে কাঁপিয়ে দিলো। এমনকি আওয়ামী লীগও কেঁপে গেলো।”
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে স্বৈরাচার এরশাদ সরকার তখন কারফিউ জারি করেছে। “চারদিকে বিপ্লব আর বিদ্রোহ” এই শিরোনামে খবরের কাগজ বেরুনোর পর রাষ্ট্রীয় চাপ বাড়ে। একদিন অফিসে তালা লাগিয়ে সবাই পালিয়ে যান। কিছুদিন পরই এরশাদের পতন হয়।
বহুল আলোচিত ‘তুই রাজাকার’
১৯৯১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজকের কাগজ বাজারে আসে। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর দৈনিকটিতে “তুই রাজাকার” নামে নতুন সিরিজ প্রকাশ শুরু হয়। একাত্তরের পাক বাহিনীর দোসরদের ব্যঙ্গ কার্টুনে অলঙ্কৃত এই সিরিজটি সারাদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ওই সিরিজ প্রকাশের পর দেশের মৌলবাদীরাও কাজী শাহেদ আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠে। আজকের কাগজ পত্রিকা অভিমুখে তখন রাজাকারদের দোসররা বিক্ষোভ মিছিলও করেছিল।
“তুই রাজাকার” সিরিজে গোলাম আযম, আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা আবদুর রহিম, আবদুস সবুর খানসহ অনেক পাকিস্তানি দোসরের ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করা হয়।