রাসেলস ভাইপার আতঙ্কে চট্রগ্রামে বেড়েছে সাধারণ সাপ হত্যা

বেশ কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে রাসেলস ভাইপার। এক সময় বিলুপ্ত ঘোষণা করা প্রাণীটি উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে বেশি ছিল। তবে এখন পদ্মা অববাহিকা ধরে ছড়িয়ে গেছে দেশের ২৬ থেকে ২৭টি জেলায়। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রাসেলস ভাইপার ভেবে অন্যান্য সাধারণ সাপ পিটিয়ে হত্যার সংখ্যা বাড়ছে।

রাসেলস ভাইপার সাপ বাংলাদেশে চন্দ্রবোড়া বা উলুবোড়া নামেও পরিচিত, তবে দেশের মানুষ বেশি চেনে ইংরেজি নামটি। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামে একদিনে অন্তত চারটি সাপকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সাপ হত্যা নিরুৎসাহিত করতে একটি জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু করেছে বন বিভাগ।

সাপ গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশগত বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে রাসেলস ভাইপারের তেমন উপস্থিতি নেই।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, কেউ যদি সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন, তাহলে তাকে শান্ত থেকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

রাসেলস ভাইপার/সংগৃহীত

এক সময় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায়, বিশেষ করে পদ্মা তীরবর্তী কয়েকটি জেলা ও চরাঞ্চলে রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত। পরবর্তীতে দেশ থেকেই বিলুপ্তপ্রায় ছিল। তবে গত এক দশকে রাজশাহী অঞ্চলে এই সাপের উপস্থিতি বেড়েছে। গত এক বছরে মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, বরিশাল, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, চট্টগ্রামসহ ২৬ থেকে ২৭টি জেলায় রাসেলস ভাইপারের আনাগোনা দেখা গেছে।

প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি জেলায় রাসেলস ভাইপারের কামড়ে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার কাছেই মানিকগঞ্জের কিছু এলাকায় গত তিন মাসে বিষধর রাসেলস ভাইপারের কামড়ে অন্তত তিনজন মারা গেছে বলে জানা যায়। এরপর ভোলাসহ আরও কয়েকটি জেলায় এ ধরনের সাপ ধরে মারার খবর আসে। এরপরই দেশে সাপটির ব্যাপক উপস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো শুরু হয়।

এ অবস্থায় সাপের কামড়ের ঘটনা সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক করতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্দেশনা দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

নির্দেশনামূলক বিবৃতিতে বলা হয়, রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষের সঙ্গে এই সাপের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এই সাপ সাধারণত নিচু ভূমির ঘাসবন, ঝোপ-জঙ্গল, উন্মুক্ত বন, কৃষি এলাকায় থাকে। মানুষের বসতি এড়িয়ে চলে। মেটে রঙের হওয়ায় এই সাপ মাটির সঙ্গে সহজে মিশে থাকতে পারে। মানুষ খেয়াল না করে কাছাকাছি গেলে, সাপটি বিপদ দেখে ভয়ে আক্রমণ করে।

রাসেলস ভাইপার দক্ষ সাঁতারু সাপ। তাই এটি নদীর স্রোত ও বন্যার পানিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়েছে। এ জন্য সবাইকে সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য বিবৃতিতে অনুরোধ জানানো হয়।

কয়েক মাস ধরেই চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার নামে সাপটি আলোচনার তুঙ্গে/আইস্টক

আতঙ্কে পিটিয়ে মারা হচ্ছে অন্যান্য সাপ

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় শুক্রবার রাত ১১টার দিকে রাসেলস ভাইপার মনে করে প্রায় ৫ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি অজগর সাপকে পিটিয়ে হত্যা করেন স্থানীয় লোকজন। এ নিয়ে এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। সাপটি দেখতে উৎসুক জনতার ভিড় জমে। পরে বন বিভাগের লোকজন এসে নিশ্চিত করে যে এটি একটি অজগর সাপ।

এছাড়াও কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ মৌলভীর কাটায় আতঙ্কিত জনতা একটি সাপকে পিটিয়ে হত্যার পর পুড়িয়ে ফেলে। পরবর্তীতে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা গিয়ে দেখেন সাপটি রাসেলস ভাইপার নয় বার্মিজ পাইথন।

এসব ঘটনার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতে স্থানীয় কর্মকর্তা ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করেছে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ।

যা বলছে কর্তৃপক্ষ

চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত রাসেলস ভাইপার দেখা যায়নি বলে ঢাকা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, “চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত রাসেলস ভাইপার কাউকে কামড় দেয়নি। কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তি অহেতুক আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। ফলে সাপ হত্যা কড়া হচ্ছে, যা আমাদের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”

তিনি আরও বলেন, “নির্বিচারে সাপ হত্যা করা হচ্ছে। শুক্রবার এক রাতের মধ্যে দুটি সাপকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। মাত্রাতিরিক্ত অপপ্রচারের ফল ভোগ করতে হচ্ছে আমাদের। এখন পর্যন্ত নিহত সব সাপ বিষাক্ত নয় এবং মানুষের জন্য ক্ষতিকরও নয়। এমনকি রাসেলস ভাইপার সাপ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সুরক্ষা আইনের অধীনে একটি সুরক্ষিত প্রজাতি। ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সাপটি। এসব সাপের বিষ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।”

সাপ না মারার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করেছি এবং সে অনুযায়ী স্থানীয় কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

সাপগুলো বেশি দেখা যাচ্ছে ফসলের মাঠে। কারণ তাদের প্রধান খাবার হল ইঁদুর, যেটি আবার ফসলের প্রধান শত্রু/আইস্টক

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্বেগ প্রকাশ

গত শনিবার সারাদেশের সিভিল সার্জন, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, বিভাগীয় পরিচালক, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেছেন, রাসেলস ভাইপারের যে অ্যান্টিভেনম, হাসপাতালগুলোতে তার পর্যাপ্ত মজুত আছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “সাপের কামড়ের চিকিৎসার বিষয়ে মন্ত্রীর নির্দেশনাকে আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। জটিলতা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। আমরা জনসাধারণকে অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। রাসেলস ভাইপারের কামড়ের রোগীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে অন্যান্য সাপের কামড়ের রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের।”

রাসেলের ভাইপার বা অন্যান্য সাপের অহেতুক ভীতি দূর করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে লিফলেট, পোস্টার ও ব্যানার বিতরণের নির্দেশনা দিয়েছেন সিভিল সার্জন।

চট্টগ্রামে রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি নিয়ে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

রাসেলস ভাইপার সাধারণত নিশাচর বা রাতে চলাচল করতে পছন্দ করে। মানুষের বাড়িঘর এলাকায় সাধারণত এরা থাকে না। থাকার জন্য ঝোপ ঝাড়, ফসলের গোলা কিংবা জমির বড় গর্ত এদের পছন্দ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সাপ গবেষক ড. মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাসেলস ভাইপারের‍ উপস্থিতি সাধারণত পদ্মা তীরবর্তী কয়েকটি জেলা ও চরাঞ্চলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা ছড়িয়ে পড়েছে আরও কয়েকটি জেলায়। তবে প্রতিকূল পরিবেশের কারণে চট্টগ্রাম-সিলেটের মতো পার্বত্য অঞ্চলে এর বিকাশের সম্ভাবনা কম।”

তিনি বলেন, “চট্টগ্রামে রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি ভিত্তিহীন।”

রাসেলস ভাইপারের বিস্তার ব্যাখ্যা করে এই গবেষক বলেন, “রাসেলস ভাইপার মূলত ইঁদুর খায়, যা ফসলের ক্ষেতে প্রচুর পরিমাণে থাকে। রাসেলস ভাইপারকে শিকার করে মূলত- পেঁচা, খাটাশ, মনিটর টিকটিকি ও কিছু শিকারি পাখি। যা আমাদের পরিবেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে সাপের বিস্তার সহজ হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “রাসেলস ভাইপার আক্রমণাত্মক সাপ, এই ধারণাটি ভুল। অন্যান্য সাপের মতো এটিও কেবল হুমকির মুখে পড়লে আক্রমণ করে এবং হিস হিস করে মানুষকে সতর্ক করে। শুধুমাত্র আফ্রিকান ব্ল্যাক মাম্বারা বিনা প্ররোচনায় আক্রমণ করতে পারে। আর রাসেলস ভাইপারের বিষ তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটাতে যথেষ্ট শক্তিশালী না। আর বাংলাদেশে এর অ্যান্টিভেনম আছে।”

“মনোক্লিড কোবরা আমাদের অঞ্চলে রাসেলস ভাইপারের চেয়ে কমপক্ষে দশগুণ বেশি বিষাক্ত। রাসেলস ভাইপার নিয়ে হঠাৎ আতঙ্ক বিস্মিত করছে। অহেতুক সাপ হত্যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে।”