যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সিদ্ধান্ত আমলে নিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার রাতে ইউজিসির ওই ঘোষণার পর বুধবার (১৭ জুলাই) সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিন্ডিকেটের সভায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ আসতে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বুধবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩-এর আর্টিকেল ২৪(এল) ধারার ক্ষমতাবলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং একাডেমিক পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে অনির্দিষ্টকালের জন্য অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় ছাত্রী ও রাত ১০টার মধ্যে ছাত্রদের হলত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫১তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় এ সিন্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের বুধবার বিকেল ৪টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলমের সভাপতিত্বে সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে বুধবার বিকেলে ৫টার মধ্যে ছাত্র এবং বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার মধ্যে ছাত্রীদের হল ত্যাগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. মঈনুল হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের শিক্ষার্থীদের বুধবার বিকেল ৪টার মধ্যে হলত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে বুধবার বিকেল ৩টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরুরি সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

চলমান সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাজনিত কারণে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ছেলেদেরকে বিকেল ৪টার মধ্যে এবং মেয়েদেরকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার মধ্যে আবাসিক হলত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

সকালে যবিপ্রবির প্রশাসনিক ভবনের সম্মেলন কক্ষে যবিপ্রবির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম রিজেন্ট বোর্ডের ১০২তম জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রিজেন্ট বোর্ডের সদস্যদের অনেকে ভার্চুয়ালি এবং সশরীরে অংশ নেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) সব শিক্ষা কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার মধ্যে হল ত্যাগ করতে বলা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. অলিউল্লাহ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে বুধবার বিকেল ৫টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

প্রসঙ্গত, চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন মঙ্গলবার বেশ সহিংস রূপ নেয়। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে ছয়জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন কয়েকশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় সারা দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। একইসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের সব কলেজ বন্ধ ঘোষণা করেছে।

এর আগে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা প্রসঙ্গে কথা বলার সময় মন্তব্য করেন “মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা কিছুই পাবে না, রাজাকারের নাতিপুতিরা সব পাবে?” প্রধানমন্ত্রীর এ মন্তব্যে ক্ষিপ্ত হন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। তারা ধরে নিয়েছেন “রাজাকারের নাতিপুতি” তাদেরই বলা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে এবং কোটা সংস্কারের এক দফা দাবিতে রবিবার মধ্যরাত থেকে আন্দোলনে নামেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।

সোমবারও দুপুর থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রলীগ। বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত থেমে থেমে চলা সংঘর্ষে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। রাত ১০টার পর আন্দোলনকারীরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং সারাদেশের সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সমর্থনে রাস্তায় নামার আহ্বান জানান।

পরদিন মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে রাজধানীর ১৫-২০টি স্থানে একযোগে সড়ক অবরোধ শুরু করেন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অবরোধে গোটা রাজধানী অচল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়াসহ দেশের প্রায় সর্বত্র শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমে আসেন। দুপুরের পর থেকে ঢাকার সায়েন্সল্যাব ও চানখারপুল এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। এসব সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হন।