বই ফেরতে দেরি হলে ১ টাকা জরিমানা, দিতে হয় ব্যাংকে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও বিজ্ঞান পাঠাগারে বই জমা দিতে দেরি হলে জরিমানা পরিশোধের নিয়ম নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও অসন্তোষ শুরু হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, বই ফেরতে বিলম্বের জন্য মাত্র ১ টাকা জরিমানা হলেও তা পরিশোধ করতে হয় ব্যাংকে গিয়ে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই নিয়মের কারণে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলা হকের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের পর বিষয়টি আবার প্রকাশ্যে আসে। বই জমা দিতে ৮ থেকে ৯ দিন দেরি হওয়ায় তাকে ১ টাকা জরিমানা করা হয় এবং সেই টাকা পরিশোধের জন্য টিএসসি এলাকার জনতা ব্যাংকে পাঠানো হয়।

বিজ্ঞান পাঠাগারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের অধীনে পরিচালিত হয়। জরিমানা পরিশোধের জন্য শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরি থেকে একটি নির্দিষ্ট ফরম দেওয়া হয়, যাতে শিক্ষার্থীর পরিচয় ও জরিমানার পরিমাণ উল্লেখ থাকে।

এদিকে গ্রন্থাগারের ওয়েবসাইটের তথ্য ও নীতিমালায় কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। ওয়েবসাইটের ‘ফাইন ডিটেইলস’ অংশে প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে ৫০ পয়সা, তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে ১ টাকা এবং পঞ্চম সপ্তাহ থেকে ৩ টাকা জরিমানার কথা বলা আছে। অন্যদিকে, গ্রন্থাগারের অধ্যাদেশভিত্তিক নীতিমালায় প্রতি বইয়ের ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহ বা তার অংশবিশেষের জন্য ২৫ পয়সা জরিমানার বিধান রয়েছে এবং সেখানে জরিমানার অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব দপ্তরে নগদে আদায়ের কথা বলা হয়েছিল। তবে বর্তমানে ঠিক কোন নিয়মে জরিমানা আদায় করা হয়, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ওয়েবসাইটে নেই।

পূজার ছুটির মধ্যে বই জমা দেওয়ার তারিখ পড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বই ফেরত দিতে পারেননি নাবিলা হক। তিনি জানান, সামান্য ১ টাকার জন্য ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানো অত্যন্ত বিরক্তিকর ও হয়রানিমূলক।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের নিয়মিত পাঠক ও শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তাকিম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে জরিমানা পরিশোধের প্রক্রিয়াটি খুব সহজেই অনলাইন সেবার আওতায় আনতে পারে। ১ টাকা জরিমানা দিতে ব্যাংকে যাওয়া ও লাইনে দাঁড়ানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। অনলাইনে পরিশোধের ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার্থীদের সময় ও ভোগান্তি দুটোই বাঁচত।”

মাত্র ১ টাকা জরিমানা ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দেওয়ার নিয়মটিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে স্বীকার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক। তিনি জানান, প্রায় ৪০-৫০ বছর আগে থেকে এই নিয়ম চলে আসছে এবং বর্তমানে ব্যাংকের মাধ্যমেই জরিমানা পরিশোধের একমাত্র পদ্ধতি চালু আছে। তবে অল্প পরিমাণ জরিমানা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প কোনো সহজ পদ্ধতি চালু করা যায় কি না, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে হওয়ায় এই নিয়ম চলে আসছে। তবে এই পুরোনো ব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীরা যেন খুব সহজে কিউআর কোড স্ক্যান করে বা অনলাইন মাধ্যমে এই জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে পারেন, সেই বিষয়ে প্রশাসন কাজ করবে।”

উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে ঢাবি প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথম বর্ষের বিভিন্ন ফি অনলাইনে জমা দেওয়ার সুযোগ চালুর কথা জানানো হয়েছিল। তবে অন্যান্য সেবায় ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ তৈরি হলেও লাইব্রেরির জরিমানা আদায়ের এই প্রাচীন পদ্ধতি এখনো ভোগান্তির কারণ হয়ে রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য।