সাত কলেজ নিয়ে এই জটিলতার শুরু ২০১৭ সাল থেকে। সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। কলেজগুলো হলো- ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার কিছুদিন পর থেকে এই সাতটি কলেজের শিক্ষার্থীরা অনেক কিছুতে সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। এর মধ্যে একটি দাবি ছিল স্বতন্ত্র একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। কিন্তু এই দাবির মধ্যে সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের একাংশ তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি জানিয়ে নতুন করে আন্দোলন শুরু করেন।
সোমবার (১৮ নভেম্বর) বিকেলে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে ১৪ জন শিক্ষার্থী সচিবালয়ে যান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিবের সঙ্গে বৈঠকে আশানুরূপ সিদ্ধান্ত না পেয়েই তারা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সচিবালয় ছাড়েন। এরপর তারা তিতুমীর কলেজে চলমান আন্দোলনে যোগ দেন।
সোমবার সন্ধ্যায় কলেজের সামনের রাস্তা অবরোধও করেন তারা। সেখানে সংবাদ সন্মেলন করে রাত ৯টার দিকে তারা ক্যাম্পাস ছাড়েন।
তিতুমীর কলেজের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী কাওসার সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউন বলেন, “আমরা মন্ত্রণালয়ে যাই সাড়ে ৩টার দিকে। সেখানে সচিবসহ অন্যদের সঙ্গে বৈঠক করি। প্রথমে আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয় তারা একটি বিজ্ঞপ্তি দেবেন। আমরা অপেক্ষা করি। কিন্তু ওপরের ফোন কলের পর তারা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশ্বাস দেন। আমরা আগামীকাল (মঙ্গলবার) পর্যন্ত অপেক্ষা করবো সিদ্ধান্তের জন্য। তারপর আন্দোলনে যাব।”
তিনি আরও বলেন, “অন্য কলেজ কী করবে সেটা তাদের বিষয়, আমরা তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর চাই।” তবে তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরের দাবির সঙ্গে একমত নয় “সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর আন্দোলন”। তাদের দাবি, তিতুমীর কলেজ নয় সাত কলেজকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হোক।
সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জাকারিয়া বারী বলেন, “আমরা সাত কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বতন্ত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান দাবিতে আন্দোলন করেছি। শিক্ষা উপদেষ্টার আশ্বাস পেয়ে আমরা আন্দোলনের গতি কমিয়ে দিয়েছি। আমাদের সঙ্গে সাতটি কলেজের সব সাধারণ শিক্ষার্থী রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা কী জন্য আন্দোলন করছে আমরা জানি না। হয়তো রাজনৈতিক বিষয় থাকতে পারে। আজকের (সোমবার) এই আন্দোলনের বিপক্ষে আগামীকাল (মঙ্গলবার) তিতুমীরসহ সাতটি কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ কলেজে প্রতিবাদ সমাবেশ করবে।”
সাত কলেজের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। এটি একটি ধারাবাহিক ব্যাপার। ঢাকা কলেজসহ সাতটি কলেজের পৃথকীকরণসহ শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে অন্য একটি কমিটি কাজ করছে। এর আগে এই সাতটি কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের কথা হয়েছে। যে কমিটি করা হয়েছে সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অতি শিগগিরই আরেকটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এই কমিটির কাজ হবে তিতুমীর কলেজসহ সাতিটি কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সুপারিশ করা। এটিই সরকারের অবস্থান।”
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “তাদের যারা পড়ায় তারা হলেন বিসিএস ক্যাডারের শিক্ষক। আর যারা প্রশ্নপত্র করেন, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এগুলো তাদের জন্য অসুবিধা ছিল। এজন্য তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে অধিভুক্তি বাতিলের জন্য। এটি তো একদিনে হবে না। সেটি করার জন্য তো প্রক্রিয়া লাগবে। যে কমিটি করা হয়েছে সেই কমিটি কলেজগুলোর প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে সুপারিশ করবে। তিতুমীর কলেজও সেখানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সুত্র জানিয়েছে, শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা সরকারি সাত কলেজে শিক্ষকতা করেন। তারা যেকোনো সময় বদলি হতে পারেন। এই কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করা সহজ বিষয় নয়। আর সাতটি কলেজ ঢাকায় প্রয়োজনও নেই। জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরের সময় পিএইচডি করা শিক্ষকদেরও আত্তীকরণ করা যায়নি। নানা জটিলতা রয়েছে। এই সাতটি কলেজ রাতারাতি বিশ্ববিদ্যালয় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের দাবি অযৌক্তিক। ঢাকার সাতটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করারও কোনো সুযোগ নেই।
স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যলয় প্রতিষ্ঠাসহ আগের সাত দফা দাবি
১. সাত কলেজ নিয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় করার অভিপ্রায়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করতে হবে।
২. সংস্কার কমিটি অনধিক ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সাত কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সাত কলেজের সমন্বয়ে শুধু একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার রূপরেখা প্রণয়ন করবেন।
৩. সংস্কার কমিটি বর্তমান কাঠামো সচল রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন; যাতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সেশন জটিলতার কোনও ধরনের পরিবেশ তৈরি না হয়।
তিতুমীর কলেজের দাবি
তিতুমীর কলেজকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে।