কফি হাউজ জমাট, শুধু নেই মান্না দে

কফি দারুণ! মহামারি শেষে কফি হাউজও জমজমাট। তাতে তারুণ্য আনন্দ আড্ডায় মাতে আয়োজন করে।

ব্যথা শুধু এটুকুই যে, নেই তাতে নেই মান্না দে'র পেয়ালা। ২০১৩ সালের এই দিনে অগণন সঙ্গীত স্মৃতি রেখে অনন্তলোকে পাড়ি জমান তিনি। তাকে জানতে, বুঝতে, মর্মমূলে রাখতে পাড়ি দিতে হবে পেছনের অনেকটা সময়।

প্রবোধচন্দ্র দে নামের শিশুটি জন্মে ছিল ১৯১৯ সালে ১ মে কলকাতায়। এ ছিল শ্রমের আরাধনা করার এক দিবস খচিত প্রহর। এর সারার্থ মিথ্যে হয়নি। ধ্রুপদী সঙ্গীতে দক্ষতা থাকলেও মান্না দে'র গান বিস্তৃত হয়ে আছে শ্রমিকসহ সর্বজনের হৃদয়ে। হাটে, মাঠে, গঞ্জে, গাঁয়ে সবাই স্বাদ নেন সে সুরের। প্রবোধ ব্যথানাশক। ডাকনাম “মান্না” হয়ে সে উপশম ঘটায় সুরে। মন ভাঙাদের কাছে উল্লাস স্রষ্টা হয়ে বরণীয় কালে কালে।

আরও অনেক শিল্পমাধ্যমের মতো সঙ্গীতও গুরুমুখী বিদ্যা। মান্না দে'র গুরু ছিলেন উস্তাদ আমান আলী খাঁন। বেশ শৈশবেই দীক্ষা। ভেতরে তা পৌঁছায় নিবিড়ভাবে। নইলে এ মায়েস্ত্রোর গাওয়া গানের সংখ্যা ৪ হাজারের বেশি হবে কেন! চাট্টিখানি কথা? ১৯৪২ সাল থেকে সঙ্গীত জগত মাতিয়েছেন মৃত্যু অবধি। মান্না দে হয়ে আছেন রবীন্দ্র উত্তর বাংলা আধুনিক গানের এক অসামান্য আঁকড়।  

ভিত্তি মজবুত হলে সে গাছ নুয়ে পড়ে না। এর মানব নজির মান্না দে। শৈশব থেকে পাওয়া ধ্রুপদী পাঠ তাকে দৃঢ়তা দেয়। লোক মাতানোর ফিল্মের গানেও তিনি সফল হয়েছে এ কারণে। বিধিপ্রদত্ত প্রতিভা না হলে এক ব্যক্তির এত গুণ থাকে কী করে! মান্না দে একাধারে গায়ক, সুরকার, গীতিকার, সঙ্গীত আয়োজক, পরিচালক ও সঙ্গত কারণেই সঙ্গীত বোদ্ধা। বাদ যাবে কেন তার লেখক সত্ত্বা? তার লিখিত আত্মজীবনী “জীবনের জলসাঘর” অনুদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। জীবনীভিত্তিক ছবি পর্যন্ত হয়েছে এ নিয়ে। বোধ হয় মানুষ আরাধ্য হলেই নিজের জীবনকে এমন জলশা ঘরে রূপ দেওয়া যায়!

৯৪ বছরের জীবনে মান্না দে স্বীকৃতি পেয়েছেন বিপুল। ভারতের সরকারের দেওয়া পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ, পদ্মশ্রী- সবই আছে তার ঝুলিতে। যে সিনেমার গানে তিনি জনপদ মাতিয়েছেন সে আঙিনা থেকে পেয়েছেন “দাদা সাহেব ফালকে” সম্মাননা। এ তো গেলো দেশের কথা। ১৯৮৫ সালে মান্না দে ফ্রান্স সরকারের দেওয়া বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার অর্জন করেন। আছে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির সম্মাননা পর্যন্ত।  

মান্না দে'র কণ্ঠটি ছিল অবিনশ্বর বৈচিত্র‍্য মাখা। ক্যারিয়ারজুড়ে প্রায় দেড়শ সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তার সহশিল্পীরা বিশ্ব সঙ্গীতের নক্ষত্রসম। কাজ করেছেন রবি শংকর, আল্লারাখা, এসডি বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, কিশোর কুমার, লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, ওস্তাদ জাকির হোসেন, নুসরাত ফতেহ আলী খান, মোহাম্মদ রফি, তালাত মাহমুদ, ফিরোজা বেগম, ভীমসেন যোগী, হৈমন্তী শুক্লা...। এ তালিকা দীর্ঘতর। বাঙালি মান্না বিস্তৃত হয়েছেন শুধু হিন্দি সিনেমার হিন্দি গানে ভর করে নয়। মারাঠি, কানাড়া, তেলেগু, গুজরাটি, নেপালী বহু ভাষায় কণ্ঠ দিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি।  

প্রয়াণেও অক্ষত থাকেন এমন শিল্পী মান্না দে। চলে যাওয়ার পর বহুভাবে চর্চিত হচ্ছে তার গাওয়া গান। এ কালের তারুণ্য মানে তাকে। বিপুল রকম রিমিক্স আর ম্যাশআপ চলছে মান্না দে'র গাওয়া গান নিয়ে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তা চলবে অনাগত ভবিষ্যতেও। তার সঙ্গীত ননস্টপ, অক্ষত। সমষ্টির মাঝে যে সৃষ্টি প্রবাহিত হয় তাই তো কালজয়ী। তাই মান্না দে রইবেন নিরন্তর জেগে থাকা নক্ষত্রের মতোন।

প্রয়াণ দিবসে এই বিরল সঙ্গীত ব্যক্তিত্বের প্রতি নতজানু শ্রদ্ধা। অনন্তলোকেও সুরে থাকুন মান্না দে।


লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা ঢাকার মিরপুরে। পড়েছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা এন্ড টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ২০০৫ সাল থেকে। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই ‘‘হুমায়ূনকে নিয়ে’’ প্রকাশিত হয়।