কেন বাড়ছে ‘জেন্টল প্যারেন্টিং’ এর জনপ্রিয়তা?

এখনই পড়তে বসো, না হলে কপালে দুঃখ আছে! - আমাদের সমাজের অধিকাংশ ঘরেই সন্ধ্যা নামলে এমন শাসনের সুর শোনা যায়। ভয় দেখিয়ে শিশুকে শৃঙ্খলায় আনার এই প্রথাগত পদ্ধতির বিপরীতে এখন জায়গা করে নিচ্ছে ‘জেন্টল প্যারেন্টিং’। এখানে আদেশ নয়, গুরুত্ব পায় কারণ। “আমি জানি তোমার এখন কার্টুন দেখতে ভালো লাগছে, কিন্তু আমাদের হোমওয়ার্কটাও তো জরুরি”- এমন সংবেদনশীল বার্তার মাধ্যমেই শিশুকে দায়িত্বশীল করে তোলার এই পথ এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

জেন্টল প্যারেন্টিং আসলে কী?

জেন্টল প্যারেন্টিং হলো এমন এক জীবনধারা যেখানে শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে তাকে বোঝার চেষ্টা করা হয়। এখানে অভিভাবক শিশুকে একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেন এবং তার চিন্তা, অনুভূতি ও পছন্দকে গুরুত্ব দেন। এতে কোনো বিষয়ে জোর করার পরিবর্তে সহানুভূতি ও মমতাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা একে ‘রেসপেক্টফুল প্যারেন্টিং’ বা ‘মাইন্ডফুল প্যারেন্টিং’ হিসেবেও অভিহিত করেন। এই পদ্ধতিতে অভিভাবক ও সন্তানের সম্পর্ক হয় বন্ধুর মতো। অভিভাবকরা শিশুর সাথে খোলামেলা কথা বলেন এবং তাদের ভাবতে শেখান, যেন তারা নিজেরাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

জেন্টল প্যারেন্টিং এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি 

কেবল আলোচনার খাতিরে নয়, এই পদ্ধতির পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। যেমন-

নিরাপদ বন্ধন (Attachment Theory): মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির মতে, যখন কোনো শিশু তার অভিভাবকের কাছ থেকে সংবেদনশীলতা পায়, তখন তার মধ্যে একটি ‘সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট’ তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব শিশুর ভবিষ্যতে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি অনেক কম থাকে।

মস্তিষ্কের বিকাশ (Neuroscience): নিউরোসায়েন্টিস্টদের মতে, অতিরিক্ত ভয় শিশুর মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ অংশকে সক্রিয় করে তোলে, যা তার যৌক্তিক চিন্তা করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা বলছে, কোমল আচরণ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে এবং নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

কর্তৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা (Authoritative Style): মনোবিজ্ঞানী ডায়ানা বাউমরিন্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু নিয়ম ও মমতার মধ্যে বড় হয় (অথরিটেটিভ স্টাইল), তারা একাডেমিক ক্ষেত্রে ভালো করার পাশাপাশি সামাজিকভাবে অনেক বেশি দক্ষ হয়। 

‘জেন্টল প্যারেন্টিং’ চর্চা করবেন যেভাবে

জেন্টল প্যারেন্টিং মানেই সবকিছুতে ছাড় দেওয়া নয়, বরং নিয়ম ও সহানুভূতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। এসময় যে বিষয়গুলো অভিভাবকদের মাথায় রাখতে হবে- 

১. প্রশংসা করা: শিশুকে সরাসরি আদেশ না দিয়ে কোনো কাজের পেছনের কারণ বুঝিয়ে বলুন। তার ছোট ছোট সাফল্যের প্রশংসা করুন।

২. আবেগকে গুরুত্ব দেওয়া: শিশু খুব রেগে গেলে বা কাঁদলে তাকে শাসন না করে পাশে থাকুন। তাকে অনুভব করান যে, আপনি তার পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন। এতে তারা নিজের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে।

৩. ভয় বনাম নিরাপত্তা: আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্সের মতে, শারীরিক বা মানসিক শাস্তি শিশুকে জেদি ও মিথ্যাবাদী করে তোলে। এর বদলে শিশুর কান্না বা জেদকে তার 'যোগাযোগের ভাষা' হিসেবে দেখে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করুন।

কেন ঝুঁকছেন নতুন প্রজন্মের অভিভাবকরা?

বিজনেস ইনসাইডার ও টুডে.কম-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানের অনেক বাবা-মা ছোটবেলায় পর্যাপ্ত সহানুভূতি পাননি। সেই অভাব থেকে তারা চান তাদের সন্তানের সাথে এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে যেখানে ভালোবাসা ও সম্মানের অভাব হবে না। যদিও কঠোর শাসনের মধ্যে বড় হওয়া অভিভাবকদের জন্য এই পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হওয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ ও পরিশ্রমের, তবুও দীর্ঘমেয়াদী সুফলের জন্য তারা এই পথ বেছে নিচ্ছেন।

জেন্টল প্যারেন্টিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুকে এই বার্তা দেওয়া যে, ‘যাই ঘটুক না কেন, আমি তোমার পাশে আছি।’ এই ভরসাটুকুই একটি শিশুকে মানসিকভাবে শক্তিশালী এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।