ট্রাক-পিকআপে ঈদে বাড়ি ফেরার ঝুঁকি আর কতদিন?

নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা প্রতি বছরই ঈদের আগে এদেশের মানুষের মধ্যে দেখা যায়। টিকিট না পাওয়া, অতিরিক্ত ভাড়া আর গণপরিবহনের তীব্র সংকট - সব মিলিয়ে চেনা এক উৎসবের আনন্দ নিমেষেই রূপ নেয় চরম ভোগান্তিতে। আর এই সুযোগেই দেশের মহাসড়কগুলোতে তৈরি হয় এক মরণফাঁদ। কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই খোলা ট্রাক আর পিকআপে গাদাগাদি করে চড়ে বসেন শত শত কর্মজীবী মানুষ।

আইন আর প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে, কখনো বা চোখের সামনে দিয়েই পণ্যবাহী বাহনগুলো পরিণত হয় যাত্রীবাহী যানে। কিন্তু এই আনন্দযাত্রার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম সত্য - সামান্য অসতর্কতা মুহূর্তেই উৎসবের আমেজকে রূপান্তর করতে পারে বিষাদে।

কেন থামছে না নিরাপত্তাহীন বাড়ি ফেরা?

সাধারণত নিম্নআয়ের পোশাক শ্রমিক, দিনমজুর এবং সাধারণ মানুষই এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার প্রধান শিকার। ঈদের সময় বাসের টিকিটের আকাশচুম্বী দাম এবং সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে কম খরচে বাড়ি ফিরতে অনেকেই বেছে নেন পণ্যবাহী ট্রাক বা পিকআপ। আবার অনেক সময় দূরপাল্লার বাসগুলোর ধীরগতি এড়াতে কিংবা লোকাল বাসের ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ভয়ে খোলা ট্রাককে ‘সহজ বিকল্প’ ভাবেন অনেকে। কিন্তু এই ভাবনাই যে জীবনের শেষ ভুল হতে পারে, তা অনেকেই অনুধাবন করতে পারেন না।

প্রতি ঈদেই দেশের মহাসড়কগুলোতে এমন মৃত্যুর মিছিল নতুন কোনো ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং যাত্রী নিরাপত্তার প্রতি চরম অবহেলার পুনরাবৃত্তি।

গত সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে ১৫ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। আহত হন আরও কয়েকজন।

এর আগে, ২০১৭ সালের ঈদ-উল-ফিতরের আগে গাজীপুর থেকে সিমেন্ট ও পোশাকশ্রমিক বোঝাই একটি বড় ট্রাক উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিল। পীরগঞ্জের কলাবাড়ি এলাকায় পৌঁছালে অতিরিক্ত বোঝাই এবং চালক নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে ট্রাকটি মহাসড়কের পাশে উল্টে যায়। ওই মর্মান্তিক ঘটনায় ১৬ জন যাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত হন। 

প্রতি ঈদেই দেখা যায় এই ট্রাক - পিকআপগুলো দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে, মারা যাচ্ছে মানুষ।

আইনের কড়াকড়ি: কাগজে-কলমে যা আছে

বাংলাদেশে পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৩৪(২) ধারা অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই পণ্যবাহী গাড়িতে মানুষ পরিবহন করা যাবে না।

যদি কোনো চালক বা মালিক এই আইন অমান্য করেন, তবে আইনের ১০২ ধারা মোতাবেক তিনি অনধিক ১ মাসের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

ঈদের আগে ও পরে মহাসড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা এড়াতে সাধারণ ট্রাক চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা থাকে। হাইওয়ে পুলিশ ও বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানাও করে থাকে। কিন্তু বিশাল এই ঘরমুখো মানুষের স্রোতের সামনে এই তৎপরতা অনেক সময়ই অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়।  

এছাড়া আইন থাকলেও এইসব আইনের প্রয়োগ দেখা যায় না। রাস্তায় সবসময় ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ গাড়ি চলতে দেখা যায়। ঈদের সময় অতিরিক্ত চাপের কারণে ও বেশি আয়ের লোভে পরিবহন মালিকরা সবরকম গাড়িই রাস্তায় নামিয়ে দেয়। এছাড়া যাত্রীরা বাড়ি যাওয়ার অন্য উপায় না পেয়ে ট্রাক বা পিক-আপের মতো ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ব্যবহার করতে বাধ্য হন।

সচেতনতাই হোক সবচেয়ে বড় আইন

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একার পক্ষে প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ট্রাক থামিয়ে এই প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন, যদি না যাত্রীরা নিজেরা সচেতন হন। জীবনের মূল্যের চেয়ে কয়েক ঘণ্টা আগে বাড়ি পৌঁছানো বা কয়েকশ টাকা বাঁচানো কখনোই বড় হতে পারে না।

সড়ক দুর্ঘটনা নয়, জেনেশুনে ট্রাকে ওঠা মানে মৃত্যুর টিকিট কাটা। এবারের ঈদে ঘরে ফেরার আনন্দ যেন কোনো পরিবারের চিরদিনের কান্না না হয়ে দাঁড়ায় - সেজন্য প্রয়োজন সচেতনতা, গণপরিবহন ব্যবস্থার সুশাসন এবং আইনের কঠোর ও নিরবচ্ছিন্ন প্রয়োগ। বাড়ি ফিরুন নিরাপদে, কারণ আপনার অপেক্ষায় কেউ একজন পথ চেয়ে বসে আছে।