কাবা শরিফের ভিতরে কি কি আছে, যেকারণে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়

সৌদি আরবের স্থানীয় সময় ৮ জিলহজ থেকে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। হজ আদায়ের জন্য চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৫ লাখের বেশি মুসলিম মক্কায় সমবেত হয়েছেন। জীবনে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য অন্তত একবার হজ আদায় করা ফরজ। অধিকাংশ মুসলিমের জীবনের অন্যতম পরম আকাঙ্ক্ষা এটি।

সব মিলিয়ে হজের আনুষ্ঠানিকতা পাঁচ দিনে সম্পন্ন হয়। হজের অংশ হিসেবে হাজিরা পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত করেন এবং ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সাতবার প্রদক্ষিণ করেন, যা তওয়াফ নামে পরিচিত।

কাবা শরিফ কিসওয়া নামের একটি কালো কাপড়ে আবৃত থাকে, যার ওপর সোনালি সুতা দিয়ে পবিত্র কোরআনের আয়াত লেখা থাকে।

আরবি ভাষায় ‘কাবা’ শব্দের অর্থ ঘনক বা চতুষ্কোণ ঘর। এটি ইসলামের পবিত্রতম স্থান এবং মক্কার মসজিদুল হারামের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।

বিশ্বের সব মুসলিম প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ান, যা কিবলা নামে পরিচিত। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই থাকুক না কেন, নামাজের মাধ্যমে কোটি কোটি মুসলিম এক কাতারে শামিল হন।

কাবা শরিফের উচ্চতা ১৩ দশমিক ১ মিটার (৪৩ ফুট), দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ৮ মিটার (৪২ ফুট) এবং প্রস্থ ১১ দশমিক শূন্য ৩ মিটার (৩৬ ফুট)।

আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) কাবা নির্মাণ করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে একাধিকবার কাবার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইলের (আ.) কাবার ভিত্তি স্থাপনের ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে।

ইসলামের আবির্ভাবের আগে কাবা ছিল আরবের বিভিন্ন গোত্রের উপাসনাকেন্দ্র। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের আট বছর পর ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর কাবার ভেতর থেকে সব মূর্তি অপসারণ করেন এবং একে এক আল্লাহর ইবাদতের স্থানে পরিণত করেন। প্রতি বছর হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ২ কোটির বেশি মুসল্লি মক্কায় আসেন।

কাবা শরিফের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি সোনার দরজা রয়েছে, যা ভূমি থেকে দুই মিটারের বেশি উঁচুতে অবস্থিত। ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি এই দরজার উচ্চতা ৩ দশমিক ১ মিটার এবং প্রস্থ ১ দশমিক ৯ মিটার।

কাবার ভেতরের অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে ধোয়ার জন্য সাধারণত বছরে দুবার দরজা খোলা হয়। ভেতরে ছাদ ধরে রাখার জন্য তিনটি কাঠের স্তম্ভ এবং ছাদে ওঠার একটি সিঁড়ি রয়েছে। মেঝে ও দেয়াল মার্বেল পাথরে মোড়ানো এবং ছাদ থেকে ঝুলানো রয়েছে লণ্ঠন।

কাবার ভেতরের কিছু দেয়াল কাপড়ে আবৃত থাকে। ঐতিহাসিকভাবে এসব কাপড় লাল, সবুজ ও গাঢ় নীল রঙের হয়ে থাকে এবং এতে বিভিন্ন নকশা থাকে।

কিসওয়া হলো সেই কালো রেশমি কাপড়, যা দিয়ে কাবা শরিফ আবৃত থাকে। ‘কিসওয়া’ শব্দের অর্থ ঢাকা বা আবৃত করা। মূলত যেকোনো ধরনের পোশাক বা আবরণ বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হলেও পরে এটি বিশেষভাবে কাবার আবরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

দক্ষিণ এশিয়ায় এটি ‘গিলাফ’ নামেও পরিচিত। ফার্সি ‘গিলাফ’ শব্দের অর্থও আবরণ বা পর্দা।

হজের সময় কিসওয়ার নিচের অংশ ওপরে তুলে রাখা হয়। কারণ, বিপুলসংখ্যক হাজি কাবার কাছে গিয়ে বরকতের আশায় এটি স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। কাপড় সুরক্ষিত রাখতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

কিসওয়ার প্রধান অংশ কালো রেশমি কাপড় দিয়ে তৈরি। এর উচ্চতা ১৪ মিটার (৪৫ ফুট) এবং এটি ৪৭টি আলাদা কাপড়ের টুকরা দিয়ে প্রস্তুত করা হয়।

বর্তমানে একটি কিসওয়া তৈরিতে ব্যয় হয় প্রায় আড়াই কোটি সৌদি রিয়াল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮১ কোটির বেশি টাকা।

কাবা শরিফের দেয়ালের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উচ্চতায় একটি কারুকার্যখচিত বেল্ট বা পট্টি রয়েছে, যা ‘হিজাম’ নামে পরিচিত। এর প্রস্থ ৯৫ সেন্টিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ৪৭ মিটার।

কাবার দরজার ওপর ঝোলানো বিশেষ পর্দাটিকে বলা হয় ‘সিতারা’ বা ‘বোরকা’। এটি কিসওয়ার সবচেয়ে সুসজ্জিত অংশ।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কাবা শরিফকে সুরক্ষিত, সম্মানিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত রাখতেই কিসওয়া দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

ঐতিহাসিকদের অধিকাংশের মতে, ইসলাম-পূর্ব যুগেই এই ঐতিহ্যের সূচনা হয়েছিল। অনেকে মনে করেন, ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আস’আদ কামিল ৪০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম কাবাকে বিশেষ কাপড়ে আবৃত করেছিলেন।

আরেকটি মত অনুযায়ী, হজরত ইসমাইল (আ.) প্রথম কাবা ঢেকেছিলেন। তবে এর পক্ষে নিশ্চিত কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

বর্তমানে কিসওয়া প্রাকৃতিক রেশম দিয়ে তৈরি করা হয়। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কাবা ঢাকতে লিনেন, তুলা, পশম এমনকি চামড়াও ব্যবহার করা হয়েছে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে খেলাফতের কেন্দ্র ছিল আরব অঞ্চল হলেও কিসওয়া তৈরি হতো মিসরে। সে সময় দামিয়েত্তা ও অন্যান্য অঞ্চলের ‘তিরাজ’ কারখানায় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উন্নত টেক্সটাইল শিল্প গড়ে ওঠে। সেখানেই কিসওয়া বোনা ও প্রস্তুত করা হতো।

তৈরি শেষে জিলহজ মাসের শুরুতে একটি আনুষ্ঠানিক কাফেলার মাধ্যমে কিসওয়া কাবার উদ্দেশ্যে পাঠানো হতো।