‘ডেস্ক জবের’ আড়ালে বাড়ছে যেসব শারীরিক ঝুঁকি

আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতি বা প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানে ‘ডেস্ক জব’ এখন সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সাধারণ পেশা। আরামদায়ক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করাকে বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, শরীরের ভেতরে এর প্রভাব ঠিক ততটাই মারাত্মক। চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার এই অভ্যাসকে এখন তুলনা করা হচ্ছে ধূমপানের সাথে। বলা হচ্ছে - ‘Sitting is the new smoking’ বা বসে থাকাই নতুন ধূমপান।

দিনের পর দিন একটানা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা চেয়ারে বসে কাজ করার ফলে মানবদেহে যেসব নীরব কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক বিপর্যয় ঘটছে, তা নিয়ে এখন চরম উদ্বেগ প্রকাশ করছেন চিকিৎসকেরা। 

মেরুদণ্ড ও ঘাড়ের পেশিতে চাপ 

দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে ভুল ভঙ্গিতে (কুঁজো হয়ে) বসে থাকার কারণে মেরুদণ্ডের ন্যাচারাল কার্ভ বা নষ্ট হয়। চিকিৎসকদের মতে, এর ফলে ক্রনিক লো-ব্যাক পেইন বা দীর্ঘমেয়াদী কোমর ব্যথা তৈরি হয়।

একইসঙ্গে, কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে তৈরি হচ্ছে ‘টেক নেক’ বা ঘাড়ের জটিলতা। মাথা সামান্য সামনে ঝুঁকে থাকার কারণে ঘাড়ের পেশিতে অতিরিক্ত ওজন বা চাপ পড়ে, যা পরবর্তীতে সারভাইকাল স্পন্ডিলাইটিস বা মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।  

অবশতা ও ‘কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম

যারা প্রতিদিন দীর্ঘসময় কিবোর্ড এবং মাউস ব্যবহার করেন, তাদের হাতের কব্জির মধ্যবর্তী স্নায়ুতে প্রচণ্ড চাপ পড়ে। এর ফলে হাত ও আঙুল ঝিনঝিন করা, অবশ হয়ে যাওয়া বা তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম’ বলা হয়। অবহেলা করলে একপর্যায়ে হাত দিয়ে কোনো জিনিস ধরাই কঠিন হয়ে পড়ে।

মেটাবলিক ক্র্যাশ ও হৃদরোগের ঝুঁকি

যখন কেউ একটানা কয়েক ঘণ্টা বসে থাকেন, তখন শরীরের ক্যালোরি বার্নিং বা শক্তি খরচের হার প্রায় শূন্যে নেমে আসে। রক্তে চর্বি ভাঙার এনজাইম (লাইপেজ) উৎপাদন কমে যায় ৯০%  পর্যন্ত।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হৃদযন্ত্রের ওপর। রক্তসঞ্চালন ধীর হয়ে যাওয়ায় ধমনিতে চর্বি জমার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, যা উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একই সাথে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে কোষগুলো ইনসুলিন প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মূল কারণ।

‘কম্পিউটার ভিশন সিন্ড্রোমও চোখের ক্ষতি

স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ মিনিটে ১৮-২০ বার চোখের পলক ফেলে। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় এই হার নেমে আসে মাত্র ৫-৭ বারে। ফলে চোখের আর্দ্রতা কমে যায় এবং ড্রাই আই বা চোখ শুষ্ক হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘ মেয়াদে একে ‘কম্পিউটার ভিশন সিন্ড্রোম’ বলা হয়, যার লক্ষণ - চোখ লাল হওয়া, ঝাপসা দেখা এবং দিনশেষে তীব্র মাথাব্যথা।

রক্ত জমাট বাঁধা বা ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস

দীর্ঘক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসে থাকার কারণে পায়ের শিরায় রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। রক্ত নিচে নেমে এলেও তা সহজে ওপরে উঠতে পারে না। এর ফলে পা ফুলে যায় এবং মারাত্মক ক্ষেত্রে পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এই জমাট বাঁধা রক্ত কোনোভাবে ফুসফুসে পৌঁছে গেলে তা তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

মুক্তির উপায়

অফিস বা কাজ ছেড়ে দেওয়া যেহেতু সমাধান নয়, তাই চিকিৎসকেরা কিছু সহজ লাইফস্টাইল পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন:

২০-২০-২০ নিয়ম: প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিনের দিকে তাকানোর পর, ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে। এতে চোখের পেশি আরাম পায়।

অ্যাক্টিভ ব্রেক: প্রতি ৪৫ মিনিট পর পর চেয়ার ছেড়ে অন্তত ২ মিনিটের জন্য দাঁড়াতে হবে বা একটু হাঁটতে হবে। ফোনে কথা বলার সময় হেঁটে হেঁটে কথা বলার অভ্যাস করা যেতে পারে।

সঠিক বসার ভঙ্গি: মনিটর যেন ঠিক চোখের লেভেলে থাকে। চেয়ারের ব্যাকরেস্ট যেন কোমরের নিচের অংশকে সাপোর্ট দেয় এবং বসার সময় পা যেন মেঝেতে সমানভাবে লেগে থাকে।

ডেস্ক জব আমাদের জীবিকা দিলেও, সচেতন না হলে তা কেড়ে নিতে পারে জীবনের স্বাভাবিক সচলতা। তাই কাজের ফাঁকেই শরীরকে সচল রাখার অভ্যাস গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।