উত্তরপ্রদেশের নারীদের কাছে যেভাবে শক্তির প্রতীক হয়ে উঠলো ‘সবুজ শাড়ি’ 

‘শাড়িতেই নারী’, এই শব্দটার সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত। তবে, নারীর শাড়ির রং-ও যে প্রতিবাদের অংশ তার প্রমাণ দিয়েছে ভারতের উত্তরপ্রদেশের গ্রামীণ জনপদের ‘সবুজ শাড়ি’ পরিহিত এক বাহিনী। যারা ‘গ্রিন আর্মি’ নামে পরিচিত। এই প্রদেশে সবুজ শাড়ি পরা নারী দেখলেই সাহস-শক্তি পান গ্রামীণ নারীসহ স্থানীয়রা। 

উত্তরপ্রদেশের নারীদের চরম দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা এবং পারিবারিক নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্বামীর হাতে নিয়মিত নির্যাতিত হওয়ার খবর এই অঞ্চলে নতুন নয়। এসবের বাইরেও আছে-গার্হস্থ্য হিংসা, মদ্যপান, জুয়াখেলা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা এবং সমাজজীবনকে গ্রাস করা নানান কুপ্রথা। এককথায়, পুরুষতান্ত্রিক একরোখা এক কাঠামো বিস্তৃত ছিল রাজ্যের বিভিন্ন জেলাজুড়ে। বিশেষ করে দলিত, অনগ্রসর শ্রেণি এবং সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের নারীরা যেসব গ্রামে বাস করতো সেসব এলাকায় এ সংকটগুলো ছিল নিত্যদিনের। 
দীর্ঘদিন ধরে মুখ বুজে সহ্য করা এসব নীরবতাকে ভেঙে গ্রামীণ নারীরা শুরু করে জনসমক্ষে প্রতিবাদ জানানো। সেই প্রতিবাদের জায়গা থেকেই জন্ম নেয় সবুজ শাড়ি আর লাঠির এক বাহিনী ‘গ্রিন আর্মি'। 

সাপ্তাহিক কাজের অংশ হিসেবে গ্রাম টহল

পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রিত গ্রামগুলোতে এখন ‘গ্রিন আর্মি’ নারীদের কাছে সাহসের নাম। যেখানে নির্যাতন, অপরাধ সেখানেই ‘গ্রিন আর্মি’ বা সবুজ শাড়ির বাহিনী। 

তবে, ‘গ্রিন আর্মি’ কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়, এটা রাজ্যের নারী-শিশুদের নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক বার্তার জন্ম দিতেই একটি উদ্যোগ। আর এই উদ্যোগের পিছনে যারা তাদের অধিকাংশই তৃণমূল স্তরের দলিত, অনগ্রসর শ্রেণির। 

শুরুর দিকে স্থানীয় নারীরা এ উদ্যোগ গ্রহণ করলেও পরে ২০১৫ সালে উত্তরপ্রদেশের কুশিয়ারি গ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় উন্নয়নমূলক সংস্থা ‘হোপ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ এই উদ্যোগটি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করতে সহায়তা করে আসছে। 

সেচ্ছাসেবামূলক এই সংস্থাটির ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, বারাণসী, মির্জাপুর ও অযোধ্যাসহ রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামে ‘গ্রিন আর্মি’র ২,৮০০-এরও বেশি সদস্য রয়েছে। প্রতিটি গ্রামে ২৫ জন নারীকে নিয়ে দল গঠনের মাধ্যমে তারা সবুজ বাহিনী গড়ে তুলেন। পরে, নারীদের সম্মিলিতভাবে নির্যাতনমূলক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে কারিগরি, সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সক্ষম করে তোলা হয়। এসব কার্যক্রমে সার্বিক সহায়তা করে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজ্য পুলিশ। 

এই বাহিনীর কাজ শুধু পুরুষের শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলা এমনটা নয়, তারা সাক্ষরতা, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষা এবং আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রান্তিক নারীদের ক্ষমতায়িত করতেও কাজ করে চলছেন। 

এই বাহিনীর সদস্যদের হাতে সবুজ রঙের প্রতীকী লাঠি-বাঁশ থাকলেও তারা আক্রমণমূলক কোনো কাজ করেন না। পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী এবং নির্যাতনকারী—উভয় পক্ষকেই প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা কাউন্সেলিং প্রদান করে সমস্যার সমাধান করেন তারা। মাদকাসক্ত পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ করতে তারা ভুক্তভোগী নারীদের অহিংস উপায়ে সমাধান করার পরামর্শ দেন। 

পুলিশের সঙ্গে ‘গ্রিন আর্মি’

চলতি বছরের জুলাই মাসে উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী ড. দয়াশঙ্কর মিশ্রের সঙ্গে মতবিনিময় করেন ‘গ্রিন আর্মি’র সদস্যরা। সেখানে সাংবাদিকরা সবুজ শাড়ির বিষয়ে জানতে চাইলে, তারা বলেন, ‘সবুজ শাড়ি আমাদের আন্দোলনের প্রতীক। ‘গ্রিন আর্মি’ কোনো বাহিনী বা সংগঠন নয়, এটা আমাদের লড়াই।’ 

তাদের মতে, সবুজ শাড়ি পড়া নারীরা অপরাধী ও সমাজবিরোধীদের কাছে একটি পূর্বঘোষিত সতর্কবার্তা। 

গ্রিন আর্মির লড়াই কেবল পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচার বা মদের আসরের বিরোধিতাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বাল্যবিবাহ, শিশু শিক্ষা উন্নয়ন, যৌতুক প্রথার বাইরেও এই বাহিনীর আরেকটি বিশেষ উদ্যোগ প্রায় পুরো রাজ্যবাসীর নজর কেড়েছে, তা হচ্ছে- কন্যাসন্তান জন্মের পর উদযাপন করা। 

এসব গ্রামের পরিবারে কন্যাসন্তান জন্ম হলে গ্রিন আর্মির সদস্যরা গিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ মা ও শিশুর সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুষ্টিকর ফল (খাবার, ওষুধ) উপহার দেন। পাশাপাশি, কন্যা শিশুটির ভবিষ্যতের জন্য ‘গোল্লাক’ বা মাটির সঞ্চয়-পাত্র উপহার দিয়ে টাকা সঞ্চয় করতে উদ্বুদ্ধ করেন। 

কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া পরিবারের পাশে

তাদের এসব উদ্যোগের পেছনে অর্থনৈতিক জোগান দেন তারা নিজেরাই। কয়েক বছর হচ্ছে- সেলাই প্রশিক্ষণ, সামাজিক দোকান, আচার উৎপাদন ও বিক্রি, বা কুটির শিল্পের মতো জীবিকামুখী উদ্যোগগুলো গ্রহণ করেছেন তারা। সেখান থেকে প্রাপ্ত আয় ও অনুদান দিয়ে তাদের এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। 

উত্তরপ্রদেশের এই সবুজ শাড়ির আন্দোলন আমাদের প্রমাণ দেয়, কেবল পুরুষদের শাসন করে বা ভয় দেখিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, যদি না নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হন। গ্রীন আর্মির মতো সারা বিশ্বের নিপীড়িত নারীরা যদি দলবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানায়, তবে অবশ্যই সমাজ বদল করা সম্ভব।