যেভাবে ট্রমা থেকে মুক্তি পেতে পারেন

ট্রমাটিক এক্সপেরিয়েন্স অনেক মানুষের জীবনেই থাকতে পারে। ছোটবেলার কোনো একটি ঘটনা যা মনের খুব গভীরে আঘাত করেছে, সেখান থেকেই শুরু হতে পারে ট্রমাটিক এক্সপেরিয়েন্স। এই আঘাতগুলো এমন পর্যায়ে চলে যায়, যেটা পরবর্তীতে এক বিশাল আকার ধারণ করে। মানসিক এবং শারীরিক দুইভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। হয়ত অনেক আগেই ছেলেবেলায় বা টিন এইজে কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা বা বীভৎস কিছু ঘটেছে, সেটাকে মোকাবিলা করে কেউ সামনে এগিয়েছে, কিন্তু ব্রেইনের সাব কন্সিয়াস স্টেইটে এই ঘটনা রয়ে গেছে; যা এডাল্ট বয়সে এসে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

এসব ক্ষেত্রে পরিবার পরিজনের প্রপার সাপোর্ট ও সাহস পেলে সহজেই বের হয়ে আসা যায়। একজন মানুষ নিজে যে ট্রমাটিক ডিসঅর্ডারে ভুগছেন, এটি আইডেন্টিফাই করা সবচেয়ে বড় ব্যাপার। আইডেন্টিফাই করতে পারলেই এর সমাধান বা ট্রিটমেন্ট সম্ভব।

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার হল ট্রমাটিক কোনো ইভেন্ট বা ঘটনার পরবর্তী ইফেক্ট যা অনেক বেশি সিমট্রমস নিয়ে আসে। এর মধ্যে কমন সিমট্রমস হল ঘন ঘন ঘুমের অসুবিধা হওয়া, অপ্রীতিকর ঘটনার বারবার ফ্ল্যাশব্যাক হওয়া, কোনো কিছুর ভয় তাড়া করে বেড়ানো, কোনো নতুন এক্সপেরিয়েন্স বা উপলব্ধি নিতে ভয় পাওয়া, সম্পর্কগুলো নিয়ে বাজেভাবে রিয়েক্ট করা, নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করা, সুইসাইডাল মনোভাব চলে আসা ইত্যাদি। 

পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের কারণগুলোর মধ্যে ছেলেবেলায় কোনো শারীরিক অত্যাচার বা মানসিক এবিউজের শিকার হওয়া, বাসায় কাউকে এবিউজ হতে দেখা, বাবা মায়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঝগড়া অথবা জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে দেখা। ছোটবেলা থেকে এই সব কিছু দেখে আসতে থাকার ফলে ব্রেইনে অনেক সময় খুব বাজে ইফেক্ট পড়ে যা বড়বেলায় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় পরিবারে এইগুলো বুঝতে পারে না যার ফলে ভিক্টিমের সুস্থতা দ্রুত হয়ে ওঠে না। এমন অনেক পরিবার আছে যেখানে সন্তানরাই ট্রমাটিক ডিসঅর্ডারে ভুগছে, বাবা মায়ের অতীত কোনো কারণে বা আচরণে অথবা পরিবারের অন্যদের কারণে, কিন্তু যখন এই মানসিক প্রব্লেম ও ব্রেইনের ডিস্ফাংশানের কথা বলা হচ্ছে, সবাই ফালতু সমস্যা বলে নাকোচ করে দিচ্ছে। তাতে সেই পরিবারের সদস্য চাইলেও প্রপার চিকিৎসা নিতে পারছে না।

প্রতীকী ছবি/ সংগৃহীত

আরেক ধরনের পোস্ট ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার আছে যা মূলত সামাজিক প্রবলেমের কারণে হতে পারে। হয়তো যুদ্ধ ফেরত যাত্রী যারা এমন কিছু ভায়লেন্স দেখেছে যেগুলো মস্তিষ্ক থেকে সরাতে পারছে না, শক সিন্ড্রোমে চলে গেছে। ইংরেজিতে এই ডিসঅর্ডারকে “শক শেল্ড” বলা হয়। এই ধরণের ক্ষেত্রে রোগীরা অনেক সময় ঘুমোতে পারে না, চোখের সামনে রক্ত বা কোনো সহিংস ঘটনা ভাসতেই থাকে। পরে এই সব থেকে মারাত্মক লেভেলের প্যানিক এটাকের সৃষ্টি হয়। 

এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে সাইকোটিক থেরাপি খুব কাজে দেয়। খুব দ্রুত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হতে হবে। সাইকোলজিস্ট যদি ভিক্টিমের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবারকেও কাউন্সেলিং করতে পারে, তাহলে সব থেকে ভালো হয়। বেশির ভাগ সময় পরিবারের মানুষরা নিজেরাই এই ডিস্ট্রেস ও ডিসঅর্ডারের কারণ হয়ে দাঁড়ায় অথচ নিজেরাও বুঝতে পারে না পরিবারের ওই ভিক্টিম কি ফেইস করছে।

ট্রমা তিন চার রকমের হয়, একিউট ট্রমা, ক্রোনিক ট্রমা, চাইল্ড হুড ট্রমা। এই ট্রমাটিক ডিসঅর্ডারের প্রভাবে প্রত্যেক ভিক্টিম আলাদা আলাদাভাবে রিয়েক্ট করে। কেউ খুব সহজে এর থেকে বের হয়ে আসতে পারে বিভিন্ন একটিভিটিজের  মাধ্যমে, যেমন ইয়োগা, জিম, হার্ড কোর এক্সারসাইজ ইত্যাদি। আবার অনেকে বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটিজে নিজেকে যুক্ত করে ফেলে, আলাদা জগত আলাদা ক্লাব করে ফেলে, তাতে এই মানসিক এবং ব্রেইনের ডিস্ফাংশান থেকে মুক্তি পায়। আবার অনেকে এই ধরণের বাইরের একটিভিটিজের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত হতে পারে না, আর তাই সারাক্ষণ পরিবারের সাহচর্য খোঁজে। 

এসব ক্ষেত্রে ব্রেইনের ফাংশান বোঝা, সাইকিয়াট্রিক ট্রিটমেন্ট নিয়ে খোলাসা আলোচনা, কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে অনেক বেশি দরকার। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা, সবুজের নিবিড়ে বেড়ে ওঠা, ডিভাইস ও ভিডিও গেইম, সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি থেকে দূরে থাকা, এই সব কিছু মানসিক বিকারগ্রস্থতা, ডিস্টারবেন্স থেকে কিছুটা হলেও মানুষকে বাঁচায়। 

ট্রমাটিক এটাক থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই ট্রিটমেন্ট নিতে হবে, প্রফেশানাল এক্সপার্টিজের কাছে যেতে হবে। কিন্তু ওভারঅল মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য যেটা প্রয়োজন তা হলো, নেচার ও গাছপালা, বাগান, কৃষি কাজের সংস্পর্শে থাকা। শারীরিক ব্যায়াম, কসরত, ইয়োগাতে কিছু সময় কাটানো, ঘরের মেনুয়েল কাজকর্ম করার চেষ্টা করা ইত্যাদি।