যেভাবে শিশুদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলা সম্ভব

একটা সময় অনেক উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত পরিবার বাড়িতে নিজস্ব গ্রন্থাগার বা বইয়ের সংগ্রহশালা রাখত। কালের পরিক্রমায় সেই অভ্যাস থেকে সরে এসেছে মানুষ। ইন্টারনেটের যুগে নতুন প্রজন্ম বই পড়ায় আগ্রহ হারাচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়াশোনায় তাদের খুব একটা আগ্রহী হতে দেখা যায় না। সাধারণ চিত্র এমনই।

এখন আর হুমায়ূন আহমেদ, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল কিংবা আনিসুল হকের মতো জনপ্রিয় লেখদের বইয়ের জন্য তীব্র অপেক্ষা কারো মধ্যে দেখা যায় না। অনেকে মনে করেন, স্কুল-প্রাইভেট-কোচিংয়ে শিশুদের বেশিরভাগ সময় কেটে যায়, সে কারণে পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়াশোনার সময় পায় না তারা। অনেক অভিভাবকের বই পড়ার অভ্যাস থাকলেও শিশুদের মধ্যে তারা সেটি গড়ে তুলতে পারেননি। শিশুদের বইমুখী করার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের বিশেষ ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

আধুনিক জীবনের বহুমাত্রিক ব্যস্ততা

সার্বিকভাবে বই পড়ায় মানুষের আগ্রহ বেড়েছে নাকি কমেছে তা নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত।

মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল ও কলেজের প্রধান শিক্ষক মো. বেলায়েত হোসাইন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “শিশুদের মধ্যে আমরা বই পড়ার আগ্রহ দেখতে পেয়েছি। কিন্তু এ বিষয়ে বাবা-মায়ের অবশ্যই খেয়াল রাখা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকদের অবশ্যই আগ্রহ দেখাতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের বই পড়ার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত উৎসাহ দেই। আমাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য লাইব্রেরির ব্যবস্থা রয়েছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লালমাটিয়া গার্লস হাইস্কুলের এক শিক্ষক বলেন, “কোভিডের আগে বাচ্চারা লাইব্রেরি থেকে বের হতে চাইত না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের মধ্যে সেই আগ্রহ আর দেখা যায় না।”

পড়াশোনার চাপে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।

পাঠক কমেছে নাকি বেড়েছে?

বাতিঘর গ্রন্থাগারে অবশ্য ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। সেখানে শিশু থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব পাঠককেও পছন্দের বইটি পড়তে দেখা গেছে। তারা নিয়মিতই এখানে আসেন। বই পড়েন এবং কিনেও নিয়ে যান।

বাতিঘরের দীর্ঘদিনের কর্মী ফয়সাল ইসলাম। তিনি বলেন, “কোভিডের আগে যেমন মানুষ আসতেন, বই পড়তেন, সময় কাটাতেন ঠিক তেমনটা এখনো হচ্ছে। তারা আগের মতো এখানে এসে পছন্দের বই পড়েন, যতক্ষণ খুশি বইয়ের সঙ্গে সময় কাটান।”

বই পড়া নিয়ে কথা হয় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর অনন্যা ও আয়শার সঙ্গে। তাদের প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। ছোটবেলা থেকেই পড়ার শখ। বাতিঘরে তাদের নিয়মিত আসা-যাওয়া।

এই দুই শিক্ষার্থীর ধারণা, মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় দেওয়ার থেকে বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করা বেশি উপকারী।

বাতিঘরের আরও দু'জন নিয়মিত পাঠক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লুৎফুন্নাহার ও সাদিয়া। তাদের কথায়, “আগ্রহ থাকলেও ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত বই পড়া হয়ে ওঠে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি সময় দেওয়া হয়। তবে বই একদমই পড়া হয় না তা বলব না, সময় পেলে অবশ্যই বই পড়ার চেষ্টা করি।”

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ২ কোটি ৩৩ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন। তাদের মধ্যে তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি।

বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলার আয়োজন

কথা হয় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আহমেদ হোসাইনের সঙ্গে।

ঢাকা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “আমরা বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের পাঠ্যবইয়ের বাইরেও যে পড়াশোনার জায়গা আছে, সে বিষয়ে উৎসাহ দিয়ে থাকি। বাচ্চাদের বই পড়ায় উৎসাহ যোগাতে দেশের প্রায় ৩০০ উপজেলায় আমাদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমরা কাজ করে থাকি।”

আহমেদ আরও বলেন, “তবে এ বিষয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন অভিভাবকরা। বাবা-মায়েরা আগ্রহ না দেখালে শিশুরা কখনোই বই পড়া শিখবে না। আমরা স্কুলে বাচ্চাদের উৎসাহ দেই। শিক্ষকরাও উৎসাহিত করেন। আর বাসায়ও এই অনুপ্রেরণাটুকু পেলেই শিশু বই পড়তে আগ্রহী হবে।”