যেকোনো দুর্ঘটনাই প্রত্যক্ষ ক্ষতির পাশাপাশি পরোক্ষভাবেও কিছু প্রভাব রেখে যায়। হোক সেটি প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ কিংবা মানবসৃষ্ট কোনো সহিংসতা কিংবা দুর্ঘটনা। আর এই পরোক্ষ প্রভাবের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা অন্যতম।
ব্যক্তি যখন কোনো দুর্ঘটনা, সহিংসতা, দুর্যোগের শিকার হন, কিংবা মর্মান্তিকভাবে প্রিয় কারো মৃত্যু বা আহত হওয়া দেখেন; তখন সেটি তার মনের ওপর বেশ মারাত্মক রকমের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
অর্থাৎ যেকোনো ধরনের ভীতিকর ও কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতাই মানুষের মনে পরবর্তী সময়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। মানসিক স্বাস্থ্যের পরিভাষায় এটিকে বলা হয়, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি।
দুর্ঘটনা কিংবা সহিংসতায় আহত ব্যক্তি, নিহতদের স্বজন, প্রতক্ষ্যদর্শী; যে কেউই আক্রান্ত হতে পারেন এই সমস্যায়।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, দেশে কোটা আন্দোলনকে ঘিরে সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন প্রায় দুই’শ মানুষ। আহত হয়েছেন আরও অসংখ্য মানুষ। হতাহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গণমাধ্যম কর্মী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ রয়েছেন। এছাড়াও ভয়াবহ সহিংসতার প্রত্যক্ষদর্শী আরও অসংখ্য মানুষ। এসব মানুষ ও তাদের স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী কিংবা সহপাঠীরা পরবর্তী সময়ে যে পিটিএসডি’তে আক্রান্ত হতে পারেন; সে শঙ্কা একবারেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই আহত ও প্রতক্ষ্যদর্শী এবং নিহতদের স্বজনদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার বিষয়ে নজর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তি নিজে কোনো কিছুর শিকার না হয়েও চোখের সামনে প্রিয় কেউ বা সম্পূর্ণ অজানা কারো প্রতি ভয়াবহ কিছু ঘটতে দেখলেও তার পিটিএসডি’তে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস মেডিসিনের তথ্য বলছে, পিটিএসডি’তে আক্রান্ত হলে যে ঘটনার কারণে এটা হয়েছে একজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বারবার ওই ঘটনার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন এমন অনুভব করেন। কিংবা আবার ঘটতে যাচ্ছে এরকম আতঙ্কও বোধ করেন।
পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের উপসর্গ
- আক্রান্ত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি নিয়ে বারবার দুঃস্বপ্ন দেখেন; আবার জেগে থাকা অবস্থায় প্রায়ই ঘটনাচক্রের পুনরাবৃত্তি তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এর ফলে ব্যক্তি প্রতিবারই তীব্র মানসিক আঘাত আর ভয় অনুভব করেন। এর ফলে ব্যক্তির নানা ধরনের শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়; যেমন- অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, বুক ধড়ফড় করা, গা গোলানো ভাব আর আতঙ্কিত হয়ে পড়া।
- আক্রান্ত ব্যক্তি এমন সব আলোচনা, স্থান এবং পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বা এড়িয়ে চলেন যা সেই দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে পারে।
- আক্রান্ত ব্যক্তি সব সময় সতর্ক থাকেন আর সুরক্ষিত পরিবেশেও বিপদের আশঙ্কা নিয়ে ভীত থাকেন। তার ঘুমে সমস্যা দেখা দিতে পারে; ঘুম কিংবা জেগে থাকা অবস্থায় মাঝে মধ্যে চমকে উঠতে পারেন।
- আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের প্রতি আবেগ-অনুভূতিহীন হয়েপড়তে পারেন এবং ক্রমশ যেকোনো কিছুর প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।
- সংশ্লিষ্ট ঘটনা মনে করিয়ে দিতে পারে এমন যেকোনো কিছু শুনলে বা দেখলে তীব্র প্রতিক্রিয়া, আতঙ্ক, উদ্বেগ বোধ করেন।
তবে সবার ক্ষেত্রেই যে পিটিএসডি হবে তা নয়। এটি নির্ভর করে ঘটনার ভয়বহতা ও ঘটনা মোকাবিলায় ব্যক্তির মানসিক ক্ষমতার ওপর। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, পুরুষের তুলনায় নারী এবং অপেক্ষাকৃত কমবয়সীদের পিটিএসডি’তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
পিটিএসডি’র প্রভাব
পিটিএসডি’তে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে অন্যান্য মানসিক সমস্যা; যেমন- অবসাদ, তীব্র উদ্বেগ, মাদকাসক্তি কিংবা আত্মহত্যার চিন্তা দেখা দিতে পারে।
করণীয়
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি এমনিতেই বেশ উপেক্ষিত। তাই, পিটিএসডি‘তে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ এই সমস্যাটি চিহ্নিত হয় না।
আপনার পরিচিত কোনো ব্যক্তির মধ্যে যদি এই ধরনের কোনো উপসর্গ লক্ষ্য করেন তাহলে তার সঙ্গে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করুন এবং তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে সহায়তা করুন। মনে রাখবেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসায় পিটিএসডি নিরাময়যোগ্য। আর অবহেলায় ঘটতে পারে আরও করুণ কোনো পরিণতি।