গ্রাফিতি যখন প্রতিবাদের ভাষা

গ্রাফিতি এমন একটি প্রদর্শনী যেখানে সমসাময়িক ঘটনা, সংঘাত, বিপ্লব, বৈষম্যেকে দেয়াল লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এই দেয়াল লেখনীর সংস্কৃতি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলা আর বাংলার মানুষের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে মিশে আছে। বিভিন্ন আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই আন্দোলনকারীরা প্রতিবাদের চিত্রগুলো এই গ্রাফিতির মাধ্যমে তুলে ধরেন। গ্রাফিতির ভাষাগুলো মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে ফেলে। এটি দেখা মাত্রই তা মানুষের মনকে নাড়াচাড়া দিয়ে বসে। সেই পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সকল আন্দোলন-প্রতিবাদকে ঘিরে এই দেয়াল লিখন চলমান রয়েছে। একদিকে এটি যেমন সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, পাশাপাশি এটি সমসাময়িক ঘটনার চিত্রগুলো ফুটিয়ে তোলে। তবে বিভিন্ন সরকারের আমলে এসব গ্রাফিতি নিষিদ্ধ করা হলেও শিল্পীরা রাতের আঁধারে সকলের আড়ালে এসকল গ্রাফিতি অঙ্কন করতেন।

/ঢাকা ট্রিবিউন

গ্রাফিতিতে মূলত ফুটে ওঠে- আন্দোলনের চিত্র, বিজয়ের চিত্র, সমসাময়িক স্লোগান সমূহ, বিভিন্ন উক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিচ্ছবি। বর্তমান সময়ে এসকল গ্রাফিতি সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কারণ, আন্দোলন আর প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর বজায় রাখে। তারা তাদের প্রতিবাদকে বিভিন্ন কৌশলে প্রদশর্ন করে থাকেন। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে এর ব্যাপক প্রচলন দেখা যাচ্ছে।

পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সময়ে পুরো বিশ্বজুড়ে গ্রাফিতি জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। এটি প্রতিবাদের ভাষাকে এমন এক শৈল্পিকরুপ দিয়েছে যা সমসাময়িক ঘটনাকে সবার নজরে আনতে সাহায্য করে। একেকটি দেয়াল যেনো একেকটি প্রতিবাদী শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রাফিতি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়নে অনেক শিক্ষার্থী নিহত হন। দীর্ঘ ১ মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলনকে ঘিরে পতন ঘটে আওয়ামী সরকারের। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পরপরই বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালগুলো গ্রাফিতিতে ভরিয়ে তোলে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন চলাকালীন বিশেষ কিছু মুহূর্ত, শহিদ হওয়া শিক্ষার্থীদের নাম, কিছু স্লোগান বা তৎকালীন সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু সহিংসতার চিত্র দারুণ নৈপুণ্যের সঙ্গে গ্রাফিতির মাধ্যমে তুলে ধরেন তারা। পরবর্তী প্রজন্ম যাতে এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত থাকে। তারা জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া এসব কর্মকান্ড ও শহিদ হওয়া শিক্ষার্থীদের ভুলতে চান না। তাদের স্মরণীয় করে রাখার জন্যই দেয়ালগুলোকে ভরিয়ে তুলেছেন গ্রাফিতি দিয়ে।

/ঢাকা ট্রিবিউন

গ্রাফিতি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. শামছুল হক তার মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন, “আমি মনে করি এটি একটি ইতিবাচক কাজ। সম্প্রতি ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে হাসিনার পতনের পর আন্দোলনের চিত্র, বিজয়ের চিত্র, ধ্বংসের চিত্র ও চিহ্ন রংতুলিতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এই দেয়াল লেখনীর মাধ্যমে। এতে মূলত ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর দ্রোহের ভাষা প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা কেমন বাংলাদেশ চাচ্ছি সেই বার্তা দেয়ালে দেয়ালে ছড়িয়ে আছে এসব চিত্রকর্মে। সবচেয়ে বড়কথা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, আবু সায়ীদ, মীর মুগ্ধদের সাহসের স্মৃতি যাতে পরের প্রজন্ম জানতে পারে সেজন্য এই গ্রাফিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”

গ্রাফিতি শিল্পীর পরিচয় লুকানোর পাশাপাশি শিল্পীর প্রদেয় বার্তাকে খুব ভালোভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করে। এর ভাবার্থ মূল্য অনেক। এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতি হিসেবে বেঁচে থাকুক।