ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার

যে রোগে মানুষ নিজের মধ্যে একাধিক চরিত্র ধারণ করেন

যেকোনো মানুষের পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্য শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতাও অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। চিকিৎসায় যা নিরাময় সম্ভব। তবে প্রচলিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি পৃথিবীতে বেশকিছু অদ্ভুত ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা বা রোগ চিহ্নিত হয়েছে; যার মধ্যে কিছু আছে বেশ বিরল। তেমনই একটি বিরল এবং অদ্ভুত মানসিক রোগের নাম হলো ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার (ডিআইডি)।

ডিআইডি রোগটি মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (এমপিডি) নামেও পরিচিত। এই রোগে আক্রান্তরা একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তিত্ব ধারণ করে থাকেন। অর্থাৎ, এই রোগে আক্রান্তরা বিচ্ছিন্ন পরিচয় বোধের সমস্যায় ভোগেন। তাদের মধ্যে একেক সময় একেক ধরনের ব্যক্তিসত্তা কাজ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যার প্রতিটি সত্তা বা চরিত্র আলাদা।

ডিআইডিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে দুই-তিনটি চরিত্র থাকতে পারে। কখনো কখনো তা আরও বেশি হতে পারে। ২০১৯ সালে জেনি হেইনস নামে এক অস্ট্রেলিয় নারী বেশ আলোচনায় এসেছিলেন। যিনি তার বাবার নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে নিজের মধ্যে প্রায় ২,৫০০ বার চরিত্র বদলেছিলেন। সে সময় তিনি তার বাবার বিরুদ্ধে আদালতে একাই ছয়টি চরিত্র হয়ে সাক্ষী দিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়ে থাকে, বিশ্বে সম্ভবত এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে এমপিডি বা ডিআইডি আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য চরিত্রগুলোর হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং সেই সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের সাজা হয়েছে। ছোটবেলা থেকে ধারাবাহিক নির্যাতন ও ট্রমার কারণে জেনির মধ্যে মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার দেখা দিয়েছিল বলে ধারণা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডিআইডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের সমস্যাটি বুঝতে পারেন না। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনের চক্রের মধ্যে থাকেন; অর্থাৎ তিনি আলাদা একটি পরিচয়ে বিরাজ করেন। এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে যাওয়ার এই ঘটনা অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক বছর পরপরও দেখা দিতে পারে। আবার মুহূর্তের মধ্যে বদলেও যেতে পারে আত্মপরিচয়।

যদিও ডিআইডিতে আক্রান্তদের পরিচয় বদলের আগে তাদের মধ্যে তেমন কোনো ধরনের সতর্কতার লক্ষণ দেখা যায় না। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। এ ধরনের রোগীরা অনেক ক্ষেত্রেই ভয়ংকর হয়ে থাকেন। তবে আশার কথা হলো, বিশ্বজুড়ে এই ধরনের রোগীর সংখ্যা “অত্যন্ত বিরল”।

ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার (ডিআইডি) আক্রান্ত ব্যক্তির সমস্যা নিয়ে হলিউড এবং বলিউডে অসংখ্য সিনেমা এবং টেলিভিশন শো নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা শাকিব খানের প্রথম প্যান ইন্ডিয়ান সিনেমা “দরদ” ডিআইডি আক্রান্ত ব্যক্তির সমস্যা নিয়ে নির্মিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সিনেমাটির টিজারে শাকিব খানের চরিত্রটিকে ডিআইডি আক্রান্ত বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে।

ডিআইডি’তে আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তাভাবনা ও অন্যান্য কাজের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। এই রোগে আক্রান্তের মধ্যে কাল্পনিক বা জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া খুব প্রিয় কোনো চরিত্রও প্রকাশ পেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি একাধিক সত্তার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন, যা থেকে তিনি নিজেকে আর আলাদা করতে পারেন না। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার পর তার অন্য সত্তাগুলো সম্পর্কে কিছু মনে থাকে না। অর্থাৎ, সেই সময়ে তিনি কী করেছেন, সেসবের কিছুই মনে থাকে না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে স্মৃতির “ব্ল্যাক আউট” বলা হয়ে থাকে।

ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডারের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। তবে প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য কিংবা যত্ন এই ধরনের ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক।

সাধারণত বড় কোনো ট্রমার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যক্তির মধ্যে ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডারের সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত রোগীদের শনাক্ত করা বেশ কঠিন। তবে বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের সঙ্গে এর উপসর্গের কিছু কিছু ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। এই ধরনের রোগীদের মধ্যে বেশকিছু মানসিক সমস্যাও দেখা দেয়। এই রোগের কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো —

  • অন্য সত্তা বা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মনে রাখতে পারে না
  • রোগী অনেক সময়ই অনুভব করেন তার সত্তা শরীর থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে
  • খুব সাধারণ ব্যক্তিগত বিষয় ভুলে যেতে থাকেন, যা সাধারণত ভুলে যাওয়ার কথা নয়
  • হতাশা
  • আত্মহত্যার প্রবণতা
  • ঘন ঘন মুড সুইং হয়
  • ঘুমের সমস্যা। যেমন- ঘুম না আসা, ঘুমের মাঝে ভয় পাওয়া, ঘুমন্ত অবস্থায় হাঁটা ইত্যাদি
  • প্রচন্ড রকম অস্থিরতা। প্যানিক অ্যাটাকের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফোবিয়া
  • খুব পুরনো কোনো স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়া এবং সেগুলোর প্রতি বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া
  • মাদকাসক্তি
  • খাবারের প্রতি অনীহা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টানা কয়েকদিন না খেয়ে থাকা
  • প্রচন্ড রকম হ্যালুসিনেশন

তবে মনে রাখতে হবে যে, উপরের কোনো লক্ষণ বা সবগুলো লক্ষণ দেখা দিলেই ব্যক্তি ডিআইডিতে আক্রান্ত বলে ভেবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেবল মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাই রোগীকে শনাক্ত করতে পারেন। তাই কোনো ব্যক্তির মধ্যে এ ধরনের কোনো লক্ষণ বা আচরণ পরিলক্ষিত হলে তার বিষয়ে কুসংস্কারবদ্ধ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, বরং তাকে নিয়ে যেতে হবে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে।