ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের বিপ্লবী গার্ডপ্রধান কে এই হোসেইন সালামি?

তেহরানের পরমাণু স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলায় ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান হোসেইন সালামি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এই হামলায় সালামিসহ আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হয়েছেন বলেও খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুক্রবার (১৩ জুন) ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ একাধিক স্থানে হামলা চালায় ইসরায়েল। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, তেহরানে আইআরজিসির সদর দপ্তরেও হামলা হয়েছে।

গত ২০ মাসে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও অস্থিরতার মাঝে একাধিক সংকটে পড়ে গেছে তেহরান। এরই মধ্যে দেশটির অন্যতম ক্ষমতাধর বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা সালামির এই মৃত্যু ইরানের নেতৃত্বে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

হোসেইন সালামিকে ইরানের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার জন্ম ১৯৬০ সালে, ইরানের গোলপায়েগান শহরে।

কলেজে পড়াকালীন ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে (আইআরজিসি) যোগ দেন। পরে বাহিনীর বিমান শাখার নেতৃত্ব দেন তিনি।

সামরিক বাহিনীতে থাকাকালেই ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে একপর্যায়ে আইআরজিসির উপ-প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের জন্য তিনি দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেন।

২০১৬ সালে এক ভাষণে সালামি বলেছিলেন, ইহুদিবাদী শাসন নিষ্ক্রিয়, পতন এবং ধ্বংস করতে উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রকেও হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।

এরপর ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জাফারিকে সরিয়ে সালামির কাঁধে আইআরজিসির ভার দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

এমন এক সময়ে তিনি আইআরজিসির নেতৃত্বে আসেন, যখন প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকাকালে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি প্রত্যাহার করে দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে আইআরজিসিকে ‘‘সন্ত্রাসী সংগঠন’’ হিসেবেও তালিকাভুক্ত করে ট্রাম্প প্রশাসন।

২০২০ সালে বাগদাদের বিমানবন্দরের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর সালামি হুঁশিয়ারি দেন, ‘‘মার্কিন ও ইসরায়েলি কমান্ডারদের পাল্টা হামলার লক্ষ্য বানানো হবে। আমাদের কমান্ডারদের হুমকি দিলে, শত্রুদের কোনো কমান্ডারই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবে না।’’

সে সময় দুটি ইরাকি ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছোড়ে ইরান, যাতে কেউ নিহত না হলেও আহত হন অনেকেই।

ইরান ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের এই ছায়াযুদ্ধ গত বছর প্রকাশ্যে সংঘাতে রূপ নেয়। ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল সিরিয়ার দামেস্কে একটি ইরানি কূটনৈতিক স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলায় আইআরজিসির অন্তত ৭ কর্মকর্তা নিহত হন, যার মধ্যে দুই জেনারেলও ছিলেন। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা প্রতিশোধের হুমকি দেন হোসেইন সালামি।

তার প্রতিক্রিয়ায় এপ্রিলের মাঝামাঝি ইসরায়েলের দিকে ৩০০টির বেশি ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। নজিরবিহীন এই হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য এক আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়।

অবশ্য ইরানের ছোড়া সেসব ক্ষেপণাস্ত্রের ৯৯% প্রতিহত করার দাবি করে ইসরায়েল। তবে কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের ভেতরে আঘাত হানে, যার ফলে তাদের একটি বিমানঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এপ্রিলের হামলার জবাবে গত অক্টোবরে ইসরায়েল বিমান হামলা চালালে ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দেয়। আর ওই ঘটনাই শুক্রবার ভোরের হামলার পথ প্রশস্ত করে।

গত বৃহস্পতিবার সালামি বলেছিলেন, ‘‘যেকোনো পরিস্থিতির জন্য ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত। শত্রুরা যদি মনে করে যে তারা যেমনভাবে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে লড়াই করে, তেমনভাবে ইরানের সঙ্গেও পারবে; সেক্ষেত্রে আমি বলে দিতে চাই- আমরা যুদ্ধক্লান্ত নই বরং প্রস্তুত।’’

তবে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি এই নেতা।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গঠিত আইআরজিসি এখন কেবল একটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবাহিনী নয়, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের একটি কেন্দ্রীয় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি রাজনৈতিক, আদর্শিক ও নিরাপত্তা-বিষয়ক আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আইআরজিসি সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনের কুদস ফোর্স এবং ফিলিস্তিনে হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে থাকে। শুধু তা-ই নয়, ইরান-ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়া ও গোষ্ঠীগুলোকে প্রশিক্ষণ, অর্থ, অস্ত্র ও কৌশলগত সহায়তাও দিয়ে থাকে অভিজাত এই ফোর্স।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সরাসরি সেনা ও কুদস ফোর্স পাঠিয়ে বাশার আল-আসাদকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছিল আইআরজিসি। তাদের মদদেই সৌদি জোটের বিরুদ্ধে লড়ছে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। আইআরজিসির কুদস ফোর্সের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাহস পায় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।

গাজায় ইসরায়েলের বিপক্ষে হামাসের লড়াইয়েও কুদস ফোর্সের ভূমিকা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অত্যন্ত চর্চিত বিষয়। ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকেও সামরিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহায়তার মাধ্যমে শক্তিশালী করায় বড় প্রভাব রয়েছে আইআরজিসির।