ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১৫ মাস বয়সী এক নিষ্পাপ শিশু নিহত হয়েছে। মর্মান্তিক এই হামলায় নিজের একমাত্র কোল আলো করে থাকা চার নম্বর সন্তানটিকে হারিয়ে সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মা ফাতিমা নোফাল (৩৮)। এর আগে ২০২৩ সালের হামলায় এই ফিলিস্তিনি নারী তার আরও তিন সন্তানকে হারিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, তীব্র গরমের কারণে আল-বুরেইজ শিবিরের ঘরের জানালার পাশে সামান্য বাতাসের আশায় ঘুমিয়ে ছিল ১৫ মাস বয়সী শিশু জায়েদ নোফাল। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে হঠাৎ ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাদের আংশিক পুনর্নির্মাণ করা বাড়িটি মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বিকট শব্দ ও ভাঙা ইটের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারায় নিষ্পাপ জায়েদ।
হামলায় মা ফাতিমা নোফালের শরীর রক্ত ও ধুলায় ঢেকে যায় এবং তার দুই পা দগ্ধ হয়। তার ছোট মেয়ে লিনাও মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
স্বজন হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়া ফাতিমা নোফাল বলেন, "ঘরটা ইট-পাথরে ভরে গিয়েছিল। আমি আহত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশীদের অনুরোধ করি যেন ধ্বংসস্তূপ থেকে আমার ছেলেকে বের করা হয়। একপর্যায়ে তাকে বের করে কাপড়ে জড়িয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।"
জায়েদের এই মর্মান্তিক মৃত্যু তার মা ফাতিমাকে ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরের বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেদিন ইসরায়েলি বাহিনীর অপর এক বিমান হামলায় নিহত হয়েছিল তার তিন ছেলে - ১৬ বছরের আমিন, ১১ বছরের হামজা এবং মাত্র ২২ দিনের নবজাতক আহমেদ।
যুদ্ধের শুরুতে একটু নিরাপত্তার আশায় সীমান্তসংলগ্ন আল-বুরেইজ ছেড়ে পরিবারটি উপকূলীয় আল-সাওয়ারহায় আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু সেখানে চালানো হামলায় তিন সন্তান ও স্বামীর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে হারান তিনি।
প্রথম হামলায় তিন ছেলেকে হারানোর প্রায় ১০ মাস পর ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল যুদ্ধের মধ্যেই জন্ম হয়েছিল জায়েদের। স্বজনহারা পরিবারটিতে জায়েদের আগমন দীর্ঘ কান্না ও কষ্টের মাঝে এক অলৌকিক আশীর্বাদ হিসেবে এসেছিল।
ফাতিমা নোফাল অত্যন্ত আকুল কণ্ঠে বলেন, "আমার স্বজনরা চেয়েছিল মারা যাওয়া সন্তানদের নামে তার নাম রাখতে, কিন্তু আমি চাইনি। আমি চেয়েছিলাম ওর নিজের একটা পরিচয় থাকুক, নিজের মতো করে বাঁচার একটা জীবন থাকুক। ও সারাটা জীবন এই যুদ্ধের চার দেয়ালের মধ্যেই কাটিয়ে গেল, একটু বাইরে বের হয়ে খেলার মতো কোনো পরিবেশও পেল না।"
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছোট মেয়ে লিনাকে এখনও জায়েদের মৃত্যুর সংবাদ জানাতে পারেননি ফাতিমা।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এই পরিবারটি তাদের আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ঘরটি থাকার উপযোগী করে তুলেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক নানা আলোচনার খবরের পরও গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত হামলায় প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের শেষ আশ্রয়স্থল।



