মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অনেকেরই মাথায় হাত পড়ে। গরমের দিনে ফ্যান ও এসি বেশি সময় চলার পাশাপাশি ফ্রিজ, পানির পাম্প, ইস্ত্রিসহ নানা বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহারও বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে মাসের বিদ্যুৎ বিলেও। কখনো কখনো আগের মাসের তুলনায় বিলের পরিমাণ বেশ খানিকটা বেড়ে যায়।
বিদ্যুৎ ব্যবহার পুরোপুরি কমিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে অপ্রয়োজনে বাতি-পাখা চালু না রাখা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্র ব্যবহার এবং এসি ব্যবহারে একটু সচেতন হলে খরচ কমানো যায়। বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে বিল নিয়ন্ত্রণে রাখার রয়েছে বেশ কিছু সহজ উপায়।
সুইচ বন্ধ রাখা
ফ্যান, বাতি, টেলিভিশন, কম্পিউটারসহ কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার না করলে সুইচ বন্ধ করে রাখুন। ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও একবার দেখে নিন, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কোনো বাতি বা ফ্যান চালু আছে কি না।
অনেক সময় বাথরুম, বারান্দা কিংবা খালি ঘরের বাতি অকারণে জ্বলে থাকে। এসব বিষয়ে একটু খেয়াল রাখলে বিদ্যুতের অপচয় কমানো সম্ভব। দিনের বেলায় পর্যাপ্ত আলো থাকলে বাতি না জ্বালিয়ে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করাও ভালো।
ইস্ত্রি বা অন্য কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার শেষে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা উচিত। কম্পিউটার বা টেলিভিশন ব্যবহার না করলে অপেক্ষমাণ অবস্থায় না রেখে পুরোপুরি বন্ধ করে রাখুন।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার
বিদ্যুৎ খরচ কমাতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রচলিত বাতির পরিবর্তে এলইডি বাতি ব্যবহার করলে তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ খরচ হয়। এসব বাতি সাধারণত দীর্ঘদিনও ব্যবহার করা যায়।
শুধু বাতি নয়, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র কেনার সময়ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। শুরুতে কোনো কোনো সাশ্রয়ী যন্ত্রের দাম কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে কম বিদ্যুৎ খরচের কারণে দীর্ঘমেয়াদে তা লাভজনক হতে পারে।
এসির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার
গরমের সময়ে বিদ্যুৎ বিল বাড়ার অন্যতম কারণ এসির অতিরিক্ত ব্যবহার। তাই প্রয়োজনের চেয়ে কম তাপমাত্রায় এসি চালিয়ে না রেখে সহনীয় তাপমাত্রায় ব্যবহার করা ভালো। এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি রাখা যেতে পারে। ঘর প্রয়োজনমতো ঠান্ডা হয়ে গেলে এসি বন্ধ করে ফ্যান চালানোর সুযোগ থাকলে সেটিও করা যায়। রাতে ঘুমানোর সময় নির্দিষ্ট সময় পর এসি বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করে রাখা যেতে পারে। এতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় এসি চালু থাকার কারণে বিদ্যুতের অপচয় কমবে।
এছাড়া এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। ফিল্টারে ধুলা জমে গেলে এসি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে বেশি সময় নিতে পারে, ফলে বিদ্যুৎ খরচও বাড়তে পারে।
মানসম্মত তার ব্যবহার
বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগের ক্ষেত্রে মানসম্মত তার ব্যবহার করা জরুরি। নিম্নমানের বা পুরোনো তার এবং দুর্বল সংযোগ থেকে বৈদ্যুতিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই বাসার বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা পুরোনো হলে নিয়মিত পরীক্ষা করানো ভালো।
কোনো তার বা সংযোগ অস্বাভাবিক গরম হয়ে গেলে, স্পার্ক দেখা দিলে কিংবা বারবার বিদ্যুৎ সংযোগে সমস্যা হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে দ্রুত পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া এসি ও ফ্রিজের মতো যন্ত্র নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করানোও দরকার। যন্ত্রপাতি ঠিকভাবে কাজ করলে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচের ঝুঁকি কমে।
সীমিত ধাপের মধ্যে থাকা
বিদ্যুতের ব্যবহার অনুযায়ী আবাসিক গ্রাহকের বিল বিভিন্ন ধাপে হিসাব করা হয়। ফলে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, সেদিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে পরবর্তী ধাপে ইউনিটপ্রতি বেশি হারে বিল হতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকার চেষ্টা করা যেতে পারে।
প্রতি মাসের বিল হাতে পাওয়ার পর শুধু পরিমাণ নয়, কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে সেটিও দেখুন। আগের মাসের সঙ্গে বর্তমান মাসের ব্যবহার তুলনা করলে কোথায় খরচ বেড়েছে, তা সহজে বোঝা যাবে।
প্রাকৃতিক শক্তির ব্যবহার
দিনের বেলায় ঘরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো থাকলে বাতি জ্বালিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। জানালা দিয়ে যাতে সহজে আলো প্রবেশ করতে পারে, সে ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে দিনের একটি বড় সময় বৈদ্যুতিক বাতি ছাড়াই কাজ চালানো সম্ভব। একইভাবে ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে দিনের বেলায় পাখার ব্যবহারও কিছুটা কমানো যায়।
সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে বাড়িতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এতে প্রয়োজনের একটি অংশ সৌরশক্তি থেকে পাওয়া সম্ভব হবে এবং প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে।
বিকল্প যন্ত্রপাতি ব্যবহার
একই কাজের জন্য সব সময় বেশি বিদ্যুৎখরচী যন্ত্র ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। কাজের ধরন অনুযায়ী কোন যন্ত্র কতক্ষণ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেদিকে নজর রাখলেও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়। যেমন - ওয়াশিং মেশিনে অল্প কয়েকটি কাপড় ধোয়ার জন্য বারবার যন্ত্র চালু না করে একসঙ্গে কাপড় ধোয়া যেতে পারে। কাপড় শুকানোর জন্যও সম্ভব হলে রোদ ও বাতাসের সুবিধা নেওয়া ভালো। এতে শুকানোর কাজে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয় না।
পানি গরম করার ক্ষেত্রে গিজার বা বৈদ্যুতিক পানির গরম করার যন্ত্র দীর্ঘ সময় চালিয়ে না রেখে প্রয়োজনের কিছুক্ষণ আগে চালু করা যেতে পারে। ব্যবহার শেষ হলে সেটি বন্ধ করে রাখুন। একইভাবে ইস্ত্রি, ব্লেন্ডার, ওভেনসহ যেসব যন্ত্র অল্প সময়ের কাজেই ব্যবহার করা হয়, সেগুলো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় চালু না রাখলে বিদ্যুতের অপচয় কমানো সম্ভব।
শেষ কথা
বিদ্যুৎ বিল কমানোর জন্য দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজের সঙ্গে আপস করার দরকার নেই। বরং বিদ্যুতের ব্যবহার কোথায় কমানো যায়, সেদিকে নজর দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনে বাতি-পাখা চালু না রাখা থেকে শুরু করে এসি ব্যবহারে সচেতন হওয়া - এমন ছোট ছোট পরিবর্তনই মাসিক খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তাই বিদ্যুৎ বিল হাতে আসার পর হিসাব মেলানোর বদলে সারা মাসের ব্যবহারেই একটু নজর রাখা ভালো। এতে বিদ্যুতের অপচয় যেমন কমবে, তেমনি মাস শেষে বিলের বাড়তি চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।