মুক্ত বাণিজ্যের ধারণা এখন অতীত?

মুক্ত বাণিজ্য সমর্থন করাও এখন সেকেলে।ধনী দেশগুলোতে চাকরি হারানোর পেছনে বড় কারণ হিসেবে এটিকে দায়ী করা হয়েছে এবং নীতিনির্ধারকরা এই ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেছেন। বিগত শতাব্দীতে সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিতে বাণিজ্যের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের সময়ও বাণিজ্য শীর্ষে ছিল কিন্তু বর্তমানে তা হ্রাস পাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সত্য, ২০১২ সালে যেখানে দেশটির অর্থনীতির ৪৮% ছিল বাণিজ্যের দখলে, সেটি এখন ২৮% এ নেমে এসেছে। বিষয়টা দুঃখজনক কারণ, মুক্ত বাণিজ্য ত্যাগ করা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা উন্নয়ন নীতিতে পরিণত হয়েছে।

বাণিজ্য যেকোনো দেশের আয় বাড়ায়, এটি কার্যকরভাবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি একটি জাতিকে বিশেষভাবে তুলে ধরে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্য যেকোনো দেশকে ২৭% বেশি ধনী করে তোলে।অর্থাৎ বাণিজ্যবিহীন দেশগুলোর তুলনায় বাণিজ্যপ্রধান দেশগুলোর আয় এক-চতুর্থাংশের বেশি।

বাণিজ্য শুধু গড় আয় বাড়ায় না। এটি চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতেও সাহায্য করে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যের ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড় আয়ের তুলনায় ২০% বেশি।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ চীন ও ভারতেও এটির প্রতিফলন দেখা গেছে। চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আয় সাতগুণ বেড়েছে এবং চরম দারিদ্র্য ২৮% থেকে প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। ভারতের পরিস্থিতিও অনেকটা একই রকম।দেশটিতে ১৯৯০ সালের ৫৬% শুল্ক ২০২০ সালে ৬% এ নামিয়ে আনা হয়। এর ফলে গড় আয় প্রায় চারগুণ বেড়েছে এবং চরম দারিদ্র্য ২২% থেকে কমে ১.৮% হয়েছে৷ দক্ষিণ কোরিয়া, চিলি এবং ভিয়েতনামের মতো অন্যান্য দ্রুত বর্ধনশীল দেশগুলোর অবস্থাও একই রকম। 

তাই ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিশ্বনেতারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেখানে মুক্ত বাণিজ্যের অর্ন্তভূক্তি আশ্চর্যের কিছু নয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত, এটিসহ এসডিজির বেশিরভাগ প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিশ্ব এখনও অনেক পিছিয়ে।

এসিডিজিতে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিরসন, রোগমুক্তি, যুদ্ধের অবসান এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসের মতো বেশকিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। তারা সবুজায়নের মতো কিছু দূরবর্তী লক্ষ্যমাত্রাও সংযুক্ত করেছেন। ১৬৯টি লক্ষ্যের অর্থ বিশেষ কোনো বিষয়ে অগ্রাধিকার না থাকার মতোই। আর এর অনিবার্য পরিণতি হলো- আমরা গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে পিছিয়ে পড়ছি।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অর্ধেকের বেশি সময় আমরা পার করে ফেলেছি। তবে, অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে বিশ্ব এখনও অনেক পিছিয়ে। এই পরিস্থিতিতে এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তা নির্দিষ্টকরণের জন্য বিগত বছরগুলোতে আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। 

গবেষণার মাধ্যমে তারা দেখিয়েছেন, বাণিজ্য বিশ্বব্যাপী এজেন্ডার শীর্ষে থাকা উচিত। গবেষণায়, ধনী-বিশ্বের রাজনীতিবিদদের দ্বারা চিহ্নিত করা চাকরি হারানোর সমস্যাগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, মুক্ত বাণিজ্যের ফলে কর্মীদের চাকরি হারানো, পুনরায় দক্ষতার অর্জন (প্রায়শই কম বেতনের চাকরিতে) বা চাকরির বাজার সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে কী পরিমাণ আর্থিক খরচ হয়ে থাকে।

গবেষণায় উচ্চ আয় এবং বিশ্বের দারিদ্র্য বিমোচনে বাণিজ্যের সুবিধার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। মুক্ত বাণিজ্যে খরচ এবং সুবিধা উভয়ই আছে। গবেষণাটি গুরত্বপূর্ণ কারণ, এটি শুধুমাত্র বৈশ্বিক স্তরে নয়, বরং বিশ্বের ধনী এবং দরিদ্র দেশগুলোর জন্য খরচ এবং সুবিধাও নির্দেশ করে।

নতুন অর্থনৈতিক মডেলে দেখানো হয়েছে, আমরা যদি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ৫% বৃদ্ধি করি, তাহলে ভবিষ্যতে সমগ্র বিশ্বের সমস্ত শ্রমিকের জন্য বর্তমানের চেয়ে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বেশি খরচ হবে। এই খরচ অবশ্যই রাজনীতিবিদদের উদ্বেগকে সমর্থন দেয়। তবে, এই ব্যযের বিপরীতে আর্থিক লাভ ১১ ট্রিলিয়ন পর্যন্ত হতে পারে, যা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।

সরকারগুলোর উচিত মুক্ত বাণিজ্যের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আরও সাহায্য করা। মনে, রাখতে হবে, বাণিজ্যের মাধ্যমে আয় বাড়ার পাশাপাশি দারিদ্র্য থেকে মুক্তির বিশাল সুযোগও সৃষ্টি হয়।

নতুন মডেলে দেখানো হয়েছে, কারা খরচ কারা বহন করে এবং কেন ধনী দেশগুলো বাণিজ্যে মনোনিবেশ করেছে। ধনী দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতির বৃহত্তর অংশের সঙ্গে যুক্ত, তারা ১১ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক অর্থনীতির ৬০% লাভ করে। কিন্তু তারা ৯০% এর বেশি খরচ বহন করে। যদিও এটি তাদের রাজনৈতিক উদ্বেগকে সমর্থন করে, তবে বৃহত্তর চিত্রটি আড়ালেই রয়ে যায়; কারণ ধনী দেশগুলো প্রতি ডলার খরচের বিপরীতে ৭ ডলার লাভ করে।

বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বাণিজ্য যে দুর্দান্ত একটি সুযোগ, সে বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়। তাদের পেছনে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ন্যূনতম খরচের বিপরীতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি লাভ করা সম্ভব। 

আমরা যদি বিশ্বের উন্নতির বিষয়ে আন্তরিক হই, তবে আমরা সবকিছুর প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না। আমাদের প্রথমে সবচেয়ে কার্যকর নীতিগুলো গ্রহণ করতে হবে। বাণিজ্য যে উন্নত জীবনমান ও আয় বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম সেটি আমাদের দ্রুত অনুধাবন করতে হবে।


ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।


এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের পঞ্চম অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-

- বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব

-  এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব

শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে

-টিকাদানে আগ্রহী হওয়া উচিত যেসব কারণে

-দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডিজিটাল সমাধান

-যক্ষ্মা নির্মূলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখনও অনেক পথ বাকি

-এসডিজি অর্জনে অপুষ্টি মোকাবিলায় আর বেশি জোর দিতে হবে