উন্নত বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষকে তাদের বসবাসের স্থানের ওপর অধিকার হারানোর বিষয়ে চিন্তা করতে হয় না। আপনার কাছে যদি দলিল বা ভাড়ার চুক্তি থাকে, তবে আগামীকাল কেউ এসেই নিজস্ব কাগজপত্র দেখিয়ে আপনাকে বের করে দিতে পারবে না। এই নিরাপত্তার অর্থ হলো, মালিকরা তার নিজের মতো করে ঘর-বাড়ি সাজাতে পারেন। পাশাপাশি এই নিশ্চয়তাও থাকে যে তারা দশকের পর দশক সেখানে থাকতে পারবেন এবং বিক্রি করার সময় সম্পত্তির উচ্চমূল্য পাবেন। কৃষকরা যদি নিশ্চিত থাকেন যে, জমি থেকে তাদের উৎখাত করা হবে না; তাহলে তারা এমন গাছ রোপণ করতে পারেন যেগুলো পরিপক্ক হতে কয়েক বছর সময় লাগে।
ভেবে দেখুন, আপনি যদি আপনার জমির মালিকানা বিষয়ে নিশ্চিত না থাকেন, কিংবা আপনার মনে যদি এই অনিশ্চয়তা থাকে যে, অদূর ভবিষ্যতে কেউ আপনাকে সেখান থেকে উৎখাত করতে পারে। তাহলে, আপনি শুধু মানসিকভাবেই বিপর্যস্ত থাকবেন না, বরং আপনার জমিতে বিনিয়োগেও আগ্রহ হারাবেন।
তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে নিরাপদ সম্পত্তির অধিকারের কথা ভাবা যেন এক ধরনের বিলাসিতা। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭০% আনুষ্ঠানিক ভূমি নিবন্ধন সুবিধার বাইরে। প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনে একজন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কায় রযেছেন। বাংলাদেশে ২৬% মানুষ তাদের নিজস্ব সম্পত্তিতেও নিজেদেরকে অনিরাপদ মনে করেন।
২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্ব নেতারা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন, সেখানে অন্যান্য প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ভূমি নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টিও রয়েছে। উন্নয়ন সংস্থাগুলো উৎপাদনশীল জমি রক্ষার ব্যাপারে তাগিদ দিলেও অগ্রগতি নগণ্য, কোনো কোনো দেশে তো কার্যত এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।
এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তা নির্দিষ্টকরণের জন্য বিগত বছরগুলোতে আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। সদ্য প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান ভূমি বিশেষজ্ঞ ড. ফ্রাঙ্ক ব্যামুগিশা এবং তার দল উন্নত ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার আশ্চর্যজনক সুফল তুলে ধরেছেন।
গবেষকরা সাব-সাহারা আফ্রিকার ওপর দৃষ্টি দিয়েছেন। এই অঞ্চলের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ভূমি অনিরাপত্তায় ভুগছে। সরকারি হিসেবে সেখানে মাত্র ১৪% মানুষের ভূমি নিবন্ধিত রয়েছে। এছাড়া এই অঞ্চলে ভূমির নিবন্ধন খরচ বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি।
রুয়ান্ডার মতো পথ অস্থিতিশীল দেশগুলো ভূমি নিবন্ধন, তথ্য ডিজিটালাইজ করা এবং আইনি ব্যবস্থায় ভূমি বিরোধ সমাধানের উদাহরণ তৈরি করেছে।
তা সত্ত্বেও, আফ্রিকায় বৃহত্তর গ্রামীণ ভূমি নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে, কারণ এই মহাদেশের গ্রামীণ জমির ৮৬% এখনও অনিবন্ধিত। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে মোট খরচ হবে প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তবে এই খরচের বিপরীতে আর্থিক লাভের পরিমাণও বিশাল। কৃষক যখন তার নিজের জমিরা মালিকানা বিষয়ে নিশ্চিত হবে, তখন তারা দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। এছাড়া নিবন্ধন নিশ্চিত হলে তারা জমির দলিল ব্যবহার করে খামারের সরঞ্জামসহ উৎপাদন খরচের জন্য ব্যাংকঋণ নিতে পারবে।
কিন্তু উৎপাদনশীলতার ওপর এক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে সে সম্পর্কে আফ্রিকা থেকে তুলনামূলকভাবে খুব কম প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে। এজন্য গবেষকদের বাকি বিশ্বের প্রমাণ ব্যবহার করতে হয়েছে। যদিও অন্য অঞ্চলের উদাহরণ আফ্রিকার পরিস্থিতি পুরোটা প্রকাশ করে না, তারপরও এটুকু অনুমান করা যায় যে- ভূমির মালিকানা নিশ্চিত হলে উচ্চ কৃষি উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে এই অঞ্চলের পরিবারগুলোর আয় প্রায় ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বেড়ে যাবে।
৪০০ বিলিয়ন ডলারের সুবিধা পেতে ২১.৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বেশ লাভজনকই। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা প্রতি ডলারের বিপরীতে লাভ ১৮ ডলার।
সাব-সাহারান আফ্রিকার শহর অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় অর্ধ বিলিয়ন লোকের জমির নিরাপত্তাও খুব শক্তিশালী নয়। শহর অঞ্চলে এক তৃতীয়াংশেরও বেশি জমি অনিবন্ধিত। সেখানকার বস্তির জমিসহ অন্যান্য জমির নিবন্ধন ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য খরচ হবে ৫.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তবে, গ্রামের তুলনায় শহরাঞ্চলে জমির মালিকানা কিছুটা ভালোভাবে নথিভুক্ত থাকায় সেখানকার জমির মূল্য গড়ে ২৫% বেশি। সেখানে বসবাসকারীদের আর্থিক এবং মানসিক নিরাপত্তাও বেশ ভালো। গবেষকরা দেখিয়েছেন, শহরের জমির নিবন্ধন পুরোপুরি নিশ্চিত করা গেলে প্রবৃদ্ধি হবে ১৬০ বিলিয়ন ডলার, যা এই খাতে খরচের ৩০ গুণ বেশি।
এসডিজির অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি পূরণে অগ্রগতি না হওয়ার অন্যতম কারণ একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরিকল্পনা করা।
আমরা যদি বিশ্বের উন্নতির বিষয়ে আন্তরিক হই, তবে আমরা সবকিছুর প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না। আমাদের প্রথমে সবচেয়ে কার্যকর নীতিগুলো গ্রহণ করতে হবে। ভূমির মালিকানা নিশ্চিতকরণ যে উন্নত জীবনমান ও আয় বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম সেটি আমাদের দ্রুত অনুধাবন করতে হবে।
ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।
এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের পঞ্চম অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-
- বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব
- এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব
- শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে
-টিকাদানে আগ্রহী হওয়া উচিত যেসব কারণে
-দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডিজিটাল সমাধান
-যক্ষ্মা নির্মূলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখনও অনেক পথ বাকি