গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘‘ঝড়ের সময়ই আম কুড়াতে হয়। ঝড় শেষে গেলে আর আম পাওয়া যায় না।” ঝড়ের পরে গেলে আম যে দু-একটি মিলবে না, তা নয়। তবে সেগুলো অন্যরা কুড়াতে চায়নি বলেই রয়ে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মাঝেমধ্যে নানান ইস্যুতে ঝড় ওঠে। সবাই তখন মোক্ষম কথাটি বলতে চান। সমস্যা হলো, বাছ-বিচার করে আম কুড়ানোর মতো অনলাইনেও ঝড়ের সময় সেই মোক্ষম কথাটি, অমিয় বাণীটিও কিন্তু হারিয়ে যায়, কথার পিঠে কথার বাণে। পরে সেগুলো আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের এক নারী ফেসবুক লাইভে এসে তার দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে অর্জিত সমস্ত সনদ আগুনে পোড়ান। তারপরে তার একটি চাকরি জোটে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোটখাট একটা ঝড়ের আবহ সৃষ্টি হয়েছিল। তবে এখানে ঝড়ের বেগ মূলত একদিকেই। বেশিরভাগ মানুষ বিষয়টাকে একরৈখিকভাবে দেখার চেষ্টা করছেন এবং সেভাবেই বাণী বর্ষণ করছেন।
বহুলচর্চিত কিছু বাক্য এমন, “চাকরি পেতে চান, ফেসবুক লাইভে এসে সার্টিফিকেট পোড়ান।” মন্তব্যের ঘরেও একটা কমন বাক্য দেখলাম, “হুম, কিন্তু নারী হতে হবে।” কেউ কেউ বলছেন, “শুধু, শুধুই আমরা চাকরির জন্য পড়াশোনা করেছি। আহা আগে জানলে এই কৌশল অবলম্বন করতাম।”
একটা অংশ সার্টিফিকেট পোড়ানোটাকে অপরাধ হিসেবে অভিহিত করছেন এবং সেটা আইনের দোহাই দিয়েই। একই সঙ্গে “অপরাধীকে” শাস্তির বদলে চাকরি প্রদান একটা খারাপ উদহারণ হলো, সেটিও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।
আমাদের গণমাধমের শিরোনামগুলোও এখানে একটু উল্লেখ করা দরকার। “ফেসবুক লাইভে এসে সনদ পোড়ানো সেই তরুণীকে চাকরি দিলেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী”, “ফেসবুক লাইভে সনদ পোড়ানো মুক্তা চাকরি পেলেন আইসিটি বিভাগে”।
ভাবলাম ঝড় যেহেতু কমতির দিকে দিকে এখন বিষয়টাকে নিয়ে একটু আলাপ করা যায়। কিন্তু সেই ঝড়ো হাওয়াতে আবার বেগ সঞ্চার করলেন, ঢাকা কলেজের এক সাবেক শিক্ষার্থী। তিনিও গত ৩০ মে তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ পুড়িয়ে সেই ছবি পরে ফেসবুকে আপলোড করেছেন।
তবে সাম্প্রতিক পূর্বসুরির তুলনায় তার বক্তব্য পরিষ্কার।
কথা হলো সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ টেনে মূলধারার গণমাধ্যমে লেখার কারণ কী? ব্যাখ্যায় না গিয়ে বরং আলাপটা শুরু করি।
প্রথমতঃ “চাকরি পেতে চান, ফেসবুক লাইভে এসে সার্টিফিকেট পোড়ান” বলে যারা ট্রল করছেন, তাদের ভেবে দেখতে বলব- যিনি সার্টিফিকেট পুড়িয়েছেন, তিনি জানতেন কি-না, তার জন্য এরকম একটা সুযোগ অপেক্ষা করছে। আমরা একটু অন্যভাবে বিষয়টাকে ভাবতে পারি কি-না?
কোন মানসিক অবস্থায় তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একটু খোঁজ নিলে হয়ত দেখা যাবে সার্টিফিকেট পোড়ানো নারীর মতো মানসিক অবস্থায় এদেশে যুবসমাজের অনেকেই রয়েছেন, চূড়ান্ত কাজটি করার সাহস তারা পাচ্ছেন না। এই ঘটনা কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অবস্থার একটা প্রতিচ্ছবিও বটে।
সরকারের গালভরা বুলি মেয়েদের জন্য শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে। কিন্তু তারপরে কী হচ্ছে? কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কি রাষ্ট্র করতে পারছে? লেখাপড়া শিখে চাকরি বাদে অন্য পেশা কি এখনও সমাজ সাদরে গ্রহণ করে? লেখাপড়া শেখা মানেই চাকরি করতে হবে এটাই তো আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বলতে পারেন, এত এত শিক্ষিত বেকারদের সবাইকে তো রাষ্ট্র চাকরি দিতে পারবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে সরকার ও রাজনীতিবিদদের বিকল্প ভাবনা কি পরিষ্কার?
কাজেই, হতাশা থেকে একজন নারী যেটা করেছেন, সেটা একজন পুরুষও করতে পারতেন। নিকট অতীতে ঠিক এমন না হলেও অন্য রকম উদহারণ রয়েছে ছেলেদের ক্ষেত্রেও এবং ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরও একজন তাকে অনুসরণ করলেন। পরেরজন কিন্তু পরিষ্কার বলেছেন, তিনি চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে সার্টিফিকেট পোড়াননি। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে তিনি এ কাজ করেছেন।
আমার মনে হয় এই কেবল শুরু। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলতে থাকবে আগামীদিনেও।
আমাদের দেশে কিছু ইস্যু আছে, যেখানে শুরুটা শুধু একজনকে করতে হয়। এরপরে সেই ইস্যুতে কথা বলা, মতামত দেওয়া, ক্ষোভ প্রকাশের মানুষের অভাব হয় না। তার মধ্যে একটি হলো নারীকে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ইস্যু। ধর্মের প্রসঙ্গে না গেলাম, এই দেশে এখনও এমন আইন রয়েছে, যেখানে নারীকে পূর্ণ মানুষের মর্যাদাই দেওয়া হয়নি। সেখানে আমরা “লেডিস ফার্স্ট”, “প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার সবাই নারী” বলে গালভরা বুলি আওড়াই। আবার “নারীদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে” বলে ক্ষোভও প্রকাশ করি।
বিষয়টিকে আমরা সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য একটি বার্তা হিসেবেও দেখতে পারতাম। যোগ্যতা অনুযায়ী কর্ম না পাওয়ার এই হতাশা সেটা শুধু ওই নারীরই নয়, সমাজের একটা বড় অংশের। তিনি বিষয়টিকে ভিন্নভাবে সামনে এনেছেন মাত্র।
বিষয়টিকে আমলে নিয়ে সরকার অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এই সমস্যা সমাধানের দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে পারতেন। কিন্তু সরকার বা দায়িত্বশীল কোনো প্রতিষ্ঠান সে পথে না হেঁটে তাৎক্ষণিক দাওয়াইয়ের ব্যবস্থা করেছেন।
ভালো-মন্দ বিচারে না গিয়ে বলব এর চেয়ে উত্তম বিকল্প ছিল। এই একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আমাদের শিক্ষাদর্শনে পরিবর্তন আসতে পারত। আমাদের মনোজগতে ছোটবেলা থেকে যে বীজ বপন করা হয় ‘‘লেখা পড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে'' সেই ভাবনার পরিবর্তনের কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত হতে পারত। এত বেশি মাত্রায় ছেলে-মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের দরকার আছে কি-না, সেই আলাপ হতে পারত। সরকারি চাকরির বিকল্প কী কী হতে পারে, সে নিয়ে আলাপ হতে পারত।
যারা অপরাধের কথা বলছেন, তাদের বলব- আমরা নিজেরা বিচারকের আসনে বসার আগে অভিসন্ধিটাকে যদি আমলে নেই, তাহলে ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত হয়। সেক্ষেত্রে সাদা চোখে আমরা যাকে বা যাদের দোষী সাব্যস্ত করি, উল্টো তার প্রতি আমাদের সহানুভূতিই প্রকাশ পাবে হয়ত। যিনি সার্টিফিকেট পুড়িয়েছেন, তিনি কিন্তু কারও ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে কাজটা করেননি, বরং নিজের ক্ষতি করেছেন।
এখন বলতে পারেন, রাষ্ট্রপ্রদত্ত সনদ এভাবে পোড়ানো আইনের লংঘন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবমাননা প্রদর্শন। সেখানেও কথা থেকে যায়, আমাদের শিক্ষা, সমাজ ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রদর্শনে এমন অসংখ্য ফাঁকা রয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ সনদধারী একজন নারী স্বেচ্ছায় এমন কাজ করেন, এর আগেও কেউ করেছেন এবং এখনও কেউ তাকে অনুসরণ করছেন।
যারা বলছেন, তাহলে এতদিন কেন পড়াশোনা করলাম, চাকরির প্রস্তুতি নিলাম, তাদের কথাও কিন্তু ঠিক। কারণ এই দেশে মাস্টার্স সম্পন্ন করে দেশের সবচেয়ে লোভনীয় চাকরির প্রস্ততি নিতে হয় উচ্চ মাধ্যমিক এবং কিছু ক্ষেত্রে মাধ্যমিকের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত বিষয় পড়ে।
আপনারা সেটা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে একজন ক্ষুব্ধ, হতাশায় নিমজ্জিত নারীকে আক্রমণ করে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। যে ক্ষোভ দেখানোর কথা রাষ্ট্রের প্রতি, রাষ্ট্রীয় আইন এবিং নীতিমালার প্রতি সেই ক্ষোভ আমি, আপনি, আমরা প্রকাশ করছি কিছুদিন আগেও আমরা যার সমগোত্রীয় ছিলাম, আছি কিংবা হতে যাচ্ছি এমন এক বা একাধিক ব্যক্তির প্রতি।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ এখানেই। অনেক কিছুই আমরা শিখি, কিন্তু সংবেদনশীলতা বলে একটা জরুরি বিষয় আমলেই নেওয়া হয়ই না বলা যায়।
তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, বিষয়টিকে আমলে নিয়ে পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নয়ন সাধনে যথাযথ নীতি এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ। নাগরিক হিসাবে আমাদের দায়িত্ব হলো, অন্য নাগরিকের আবেগ-অনুভূতির প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই কথা বলা। আর গণমাধ্যমের এখানে ভূমিকা রয়েছে দারুণভাবে। ওই ঘটনায় সংবাদ প্রতিবেদনের শিরোনামগুলো কি অন্যরকম হতে পারত না? এই শিরোনামগুলো কিন্তু ফেসবুক লাইভে সার্টিফিকেট পোড়ানো সেই নারীর প্রতি সহানুভূতি কিংবা সংবেদনশীল আচরণের বিপরীতে চটুল বাক্যবাণের ঝড়কেই বেগবান করে।
একই সঙ্গে ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী যতগুলো চাকরির চেষ্টা করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন, তার সবগুলোই কিন্তু সরকারি চাকুরি। আমাদের মনোজগতে যদি এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছি, মানেই আমাকে একটা সরকারি চাকরিই করতে হবে, তাহলে সেটাও একটা সংকট বটে। সেই চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে গতানুগতিক কিছু ক্ষেত্রে জ্ঞান, মূলত তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয় বটে, কিন্তু দক্ষতা বৃদ্ধি পায় না। ফলে যা হওয়ার, তাই হয়। সরকারি তো নয়ই বেসরকারি চাকরি পাওয়াও তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়। এমনকি চাকরি একটা পেলেও খাপ খাওয়াতে, মানিয়ে নিতে বেগ পেতে হয়।
মনোজগতে সরকারি চাকরির জন্য এই আকুলতার জন্য দায়ী কিন্তু আমাদের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রদর্শন।
আমরা আশা করি এবং বিশ্বাস করতে চাই, এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে, পরিবর্তন আসবে রাষ্ট্রদর্শনেও। রাষ্ট্র নাগরিকদের সমমর্যাদা নিশ্চিত করবে। নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। এজন্য আলাপ জরুরি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে শুরু হতে পারে সেই আলাপের সূত্রপাত।
মানবাধিকার কর্মী অপূর্ব দাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। লেখাপড়া করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানবাধিকার, নারী অধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমি অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।