সতেরো কোটি জনসংখ্যার দেশের জনপ্রিয় শোবিজ তারকা পরীমণি। বাক্যটা যতটা সহজ করে বলা গেল তার ব্যাখ্যা ততটা সহজ না। সতেরো কোটির মার্কেট যদি ধরি তাহলে এটি পৃথিবীর যেকোনো দেশের তুলনায় একটা বড় মার্কেট প্লেস। এতো বড় একটা জায়গার বড় তারকাই বলা চলে পরীমণিকে। কিন্তু তিনিও দেশের আর অন্য তারকাদের মতো ব্যক্তি জীবন নিয়েই বেশি আলোচনায় থাকেন। এটি বাংলাদেশের শোবিজের স্বাভাবিক দুঃখজনক ঘটনাই। আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে সেই সীমাবদ্ধতার শূন্যস্থান তারকার ব্যক্তিজীবন দিয়ে ভরাট করা কোনো সঠিক সমাধান হতে পারে না। এসব আলোচনাকে বাদ রেখে আজকের আলাপটা করা যাক।
মঙ্গলবার (৩০ মে) সারাদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর সংবাদমাধ্যমে শোবিজ অঙ্গনের সবটাজুড়ে ছিলেন পরীমণি, শরীফুল রাজ, সুনেরাহ বিনতে কামাল, তানজিন তিশা এবং নাজিফা তুষি। তিন অভিনেত্রী বন্ধুর সঙ্গে পরীমণির স্বামী ও চিত্রনায়ক শরীফুল রাজের কিছু একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ফুটেজ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। আর তাতে প্রথমে পরীমণিকে ইঙ্গিতে দোষ দেওয়া হয়েছে। সেই সূত্র ধরেই পরীমণি নানা কথা বলেছেন। তার মধ্যে প্রধানতম হলো “সংসার ভাঙার” আশঙ্কার কথা।
যে পরীমণির উত্থান সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এক ধরনের যুদ্ধ করেই। গ্রাম থেকে উঠে আসা শামসুন্নাহার স্মৃতির পরীমণি হয়ে ওঠা অনেকটা সিনেমার কাহিনীর মতোই। মাকে হারিয়েছেন খুব কম বয়সেই; সংবাদমাধ্যম বলছে, তার বাবারও মৃত্যু হয়েছে দুর্বৃত্তের গুলিতে। বাবা-মা হারা পরীর বর্তমান অভিভাবক নানাকে প্রায়ই পরীর পারিবারিক অনুষ্ঠানে দেখা যায়। নানা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে পরী যখন ক্রমে এগোচ্ছেন তার পদক্ষেপগুলোও ছিল সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থার সাথে সংঘাতপূর্ণ। ঘটা করে জন্মদিন পালন; এবং জন্মদিনের আয়োজন, পোশাক আশাকও মানুষের আলোচনার মধ্যে থাকে। নিশ্চয় কাউকে নাড়া না দিলে সেটি আলোচনার অংশ হবে না। গিটারের তারে যেমন টোকা না দিলে শব্দ তৈরি হয় না। তেমনিভাবে নাড়া দিয়ে দিয়ে এগিয়েছেন তিনি। বোট ক্লাবে ধর্ষণ চেষ্টার মুখোমুখি হয়ে ক্ষমতা আর বিত্তবানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভয়েজ তৈরি করছেন। কারাগারে গেলেন মাদককাণ্ডে। সেসময় নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সমর্থন পেয়েছেন তিনি। এর একমাত্র কারণ স্বাধীনচেতা মনোভাব আর প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা। ২৭ দিন কারাগারে থাকার পর তিনি যেভাবে কারাগার থেকে বের হয়েছিলেন তা ছিল রীতিমতো অন্যতম প্রতিবাদের একটি অংশ। হাতে মেহেদি দিয়ে লেখা ইংরেজিতে লেখা লাইনটি অনেকের ফেসবুক ওয়ালে তখন ঝুলছিল। হাস্যোজ্জ্বল মুখে ছাদখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে ভক্তদের উদ্দেশে হাত নাড়াচ্ছিলেন তিনি। পরনে ছিল সাদা টি-শার্ট। মাথায় সাদা ওড়না পেঁচানো আর চোখে ছিল রোদচশমা। ভিন্ন এক পরীমণিকে মানুষ পেয়েছিল তখন। তখন তিনি বলেছিলেন, “তিনি ভেঙে পড়ার মতো মানুষ নন।”
সংগৃহীতসেই পরীই কেন এখন বারবার সংসার বাঁচানোর জন্য ভেঙে পড়ছেন? কিছুদিন আগে চিত্রনায়িকা বিদ্যা সিনহা মিমকে নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন পরীমণি। তখনও তিনি বলেছিলেন, মিম শরীফুল রাজের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন। পরীমণির সংসার ভাঙতে চাচ্ছেন। একই অভিযোগ এখন আবার শোনা গেল। পরীমণি সুনেরাহদের সঙ্গে ফাঁস হওয়া ভিডিও প্রসঙ্গে বলেছেন, সুনেরাহ তার সংসার ভাঙতে চাচ্ছেন। এর আগে রাজের বিরুদ্ধেও মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। অবশ্য রাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার দু একদিনের মধ্যে তা মিটমাটও হয়েছে। সেটিকে পারিবারিক ঝামেলা বলা যায়; তারপরও সেখানেও পরী সংসার টিকে রাখার একটা বার্তা প্রচ্ছন্নভাবে দিতেন।
সংবাদমাধ্যম বলছে, পরীমণি শরীফুল রাজের সঙ্গে সংসার পাতানোর আগে আরও দুয়েকজনের সঙ্গে ঘর বেঁধেছিলেন। কিন্তু দুরন্ত পরী ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোথাও থিতু হননি। সেইসব সংসারের বন্ধন ছিন্ন করেছেন। তাহলে সেই পরীই কেন সংসারের বন্ধনকেই ধ্রুব বলে মনে করছেন?
এই প্রসঙ্গে আলাপ করার আগে এখনো আলোচনায় থাকা একটি জনপ্রিয় মামলার প্রসঙ্গ টেনে নেওয়া যাক। তাহলে হয়তো পরীমণির চাওয়াটাকে বুঝতে সুবিধা হবে। ক্রিকেটার নাসির হোসেন, তামিমা ও তামিমার সাবেক স্বামী রাকিবের মামলাটির কথা ধরা যাক। বিচারে কী হবে সেই আলোচনায় না গিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি, যখন তামিমা আরেকজনের সঙ্গে সংসার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তখন রাকিব কেন তাকে ধরে রাখতে চাচ্ছেন? কোনো উপায় না পেয়ে শেষমেষ আইনের আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন রাকিব। কেন তিনি শেষ পর্যন্ত লড়তে চাচ্ছেন। এই বিষয়টি বোঝার জন্য ভারতীয় একটি চলচ্চিত্রের কথা বলি, হয়তো বুঝতে সহজ হবে। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের “পোস্ত”। সেখানে একটি শিশুকে ঘিরে তার দাদা ও বাবার মধ্যে দুইটা আবেগের লড়াই। যা আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
সিনেমার কাহিনী এ রকম সাত বছরের পোস্ত থাকেন দাদুর সঙ্গে শান্তি নিকেতনে। সেখানেই তার দারুণ একটা পৃথিবী রচিত হচ্ছিল। অন্যদিকে সন্তান দূরে থাকা কর্মব্যস্ত পোস্তর বাবা-মায়ের মানসিক দহন। নানা ফ্রেমে দুই আবেগের যুদ্ধ চলে। পোস্তর বাবা অর্ণব আর মা সুস্মিতা পোস্তকে নিয়ে উড়াল দিতে চান দেশের বাইরে। সেটিকে আটকে রাখার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন দাদু দীনেন লাহিড়ী।
সেখানে একটা ভয়ঙ্কর রকমের সত্য দর্শকের সামনে নিয়ে আসেন শিবপ্রসাদরা। তিনি দেখান ক্রমাগত ছোট হয়ে আসা দুনিয়ায় মানুষের আবেগগুলো মরে যাচ্ছে। সেই মৃতপ্রায় আবেগের অত্যন্ত মৃদু উচ্চারণ করেন দীপেন লাহিড়ী। তিনি বলেন, আর কটা দিন নাতিকে কাছে রাখার উপায় হিসেবে তিনি আদালতে গেছেন।
পরীমণি-শরিফুল রাজ/ সংগৃহীতরাকিবও ঠিক একই কারণে আদালতে গেছেন। যদিও এখানে তামিমা তার সঙ্গে থাকতে চান না; আর পোস্ত দাদুর সঙ্গে থাকতে চান। সামান্য ভিন্নতা থাকলেও মানুষের সম্পর্ককে আগলে রাখার প্রবণতার দিক থেকে দুটি বিষয় একই। পরীমণিও ঠিক একই যত্নের ভেতর নিজের বাসনাকে লালন পালন করেন। এ জন্যই তিনি মিমের সঙ্গে রাজের ঘনিষ্টতা বা সুনেরাহদের সঙ্গে রঙঢঙ বা রাজের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগগুলো তোলেন বলেই মনে হয়। “ঘর পোড়া গরুর” মতো পরীও ধোয়া দেখলেই আঁতকে ওঠেন। শঙ্কা প্রকাশ করেন সংসার হারানোর।
নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন বিষয়টারে ব্যাখ্যা করেছিলেন কিছুদিন আগে। তসলিমা ফেসবুকে লিখেছিলেন, “পরীমণির জীবনটা অনেকটা আমার জীবনের মতো। মানুষকে ভালোবাসে, বিশ্বাস করে, আঘাত পায়, কাঁদে, সরে আসে, আবার বিশ্বাস করে, আবার আঘাত পায়, আবার কাঁদে, আবার সরে আসে, আবার বিশ্বাস করে। এ যেন একটা চক্রের মতো। সৎ, সরল এবং সংবেদনশীল মানুষই এই চক্রের মধ্যে পড়ে যায়।
পরীমণি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, ও যদি মাথা উঁচু করে, মেরুদণ্ড সোজা করে একা বাঁচতে না পারে, তবে আর পারবে কে? আমি পেরেছি। আরও অনেকেই পেরেছে। নিজেকে ভালোবাসলে পারা যায়। আমাদের তো এই দোষ, আমরা নিজেকে ভালোবাসি না। জগতের আর কোনো প্রাণী নয়, এই আমরা মেয়েরাই আমাদের আততায়ীকে ভালোবেসে তার সঙ্গে এক ঘরে, এক ছাদের তলায় বাস করি!”
ভালোবাসার কাছে অসহায়ভাবে কখনো কঠোরভাবে বসতে জানেন পরী। আর বারবার উচ্চারণ করেন ঘর টিকিয়ে রাখার কথা।
লেখক: কবি, সাংবাদিক
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।