Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

লাগামহীন তারকাদের থামাবে কে?

  • তারকাদের যদি রাস্তাঘাটে সবখানে পাওয়া যায় তাহলে মানুষ পকেটের পয়সা খরচ করে কেন দেখবে
  • রহস্য না থাকলে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের কেন আগ্রহ থাকবে
আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:৪৩ পিএম

চলচ্চিত্রের তারকারা সাধারণ মানুষের কাছে সবসয়ই অন্যতম আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। কাছ থেকে পর্দার তারকাদের একটিবার দেখার জন্য দুর্নিবার ব্যাকুলতা, তাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানার জন্য অধীর আগ্রহ মানুষের চিরায়ত। তারকাদের দেখার জন্য বিএফডিসির গেটে দিনের পর দিন অপেক্ষা ছিল একসময়ের স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু দিন বদলে গেছে, প্রযুক্তির সহজলভ্যতার যুগে তারকরাও যেন হয়ে উঠেছেন সহজলভ্য। কোনো কোনো তারকা তো সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে নিজেকে দোকানের পণ্যের মতো উন্মুক্ত করে রেখেছেন। যে কেউ চাইলেই তাকে ঘেঁটে দেখতে পারছেন।

প্রশ্ন হতে পারে, এতে অসুবিধা কোথায়? হ্যাঁ, অসুবিধা আছে। কোনো জিনিস যখন সহজলভ্য হয়ে ওঠে তখন তার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়। একজন তারকাকে সবখানে পাওয়া গেলে মানুষ পকেটের পয়সা খরচ করে কেন তাকে দেখবে? রহস্যই বিনোদন জগতের পুঁজি। এ জগতের তারকাদের সবটুকু খোলাসা হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের কেন আগ্রহ থাকবে?

উদাহরণ হিসেবে ঢাকাই সিনেমার বর্তমান সময়ের আলোচিত নায়িকা শবনম বুবলী, অপু বিশ্বাস এবং নায়ক জায়েদ খানের কথাই ধরা যাক।

ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের সঙ্গে বিয়ে ও বিচ্ছেদ নিয়ে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছেন অপু-বুবলী। কিছুদিন পরপরই তারা একে অপরকে নিয়ে করছেন নেতিবাচক মন্তব্য। ঘটছে কল রেকর্ড ফাঁসের মতো ঘটনাও। নাম ধরে বললে এরকম আরও অনেক তারকার নামই বলা যাবে যারা চিরায়ত জীবনধারার বাইরে গিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয় সহজলভ্য করে তুলেছেন সাধারণ মানুষের কাছে।

এমনকি কিছুদিন আগে সেলিব্রেটি ক্রিকেট লিগকে ঘিরে তারকাদের ঝগড়ায় জড়ানোর ঘটনাও উদাহরণ হিসেবে টানা যেতে পারে। খেলতে নেমে তারা অপ্রত্যাশিতভাবে নিজেদের মধ্যে হাতাহাতিতে জড়িয়েছেন, এমনকি একে অপরকে নিয়ে প্রকাশ্যে করেছেন নানা মন্তব্য। যা তারকাদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। 

তবে এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে জায়েদ খানকে নিয়ে কাটাছেঁড়া বেশি করা যেতে পারে। কারণ, নেট দুনিয়ায় বাংলাদেশের যেকোনো তারকার চেয়ে এখন অনেক বেশি “ভাইরাল” জায়েদ খান। তিনি আলোচ্য কারণ- জায়েদ শুধু একজন শিল্পীই নন। দেশের শিল্পীদের এক সময়ের জনপ্রিয় নেতাও। তাই অন্য যে কারো চেয়ে জায়েদ খানের জবাবদিহিতা বেশি থাকা উচিত।

ভিউ বাণিজ্যের এই যুগে জায়েদ খানের কোনো ভিডিও ক্লিপ মানেই লাখ লাখ ভিউ। আর এই ভিউয়ের জোয়ারেই গা ভাসিয়ে দিয়েছেন তিনি। একের পর এক অতিকথন আর বালখিল্য হয়ে উঠেছে তার নৈমিত্তিক অভ্যাস। বেশি বেশি ভিউয়ের আশায় ইউটিউবার এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটররাও সেগুলো লুফে নিচ্ছেন।

বেশি বেশি ভিউ বা ভাইরাল হওয়া মানেই কি জনপ্রিয়তা?

নিশ্চয়ই না। সামজিক যোগযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার এই যুগে আমরা অনেককেই গালি দিয়ে, অশুদ্ধ উচ্চারণে গান গেয়ে বা অভিনয় করে, ইচ্ছেমতো ছন্দ মিলিয়ে ভাইরাল হতে দেখেছি। তাদের ভিউও অনেক বেশি। কিন্তু তারা কি আসলেই জনপ্রিয়? সেগুলো মানুষের ক্ষণিকের হাসির খোরাক জোগায় মাত্র।

চলচ্চিত্রের তারকাদের কাজ নিশ্চয়ই সেরকম সস্তাভাবে লোক হাসানো হয়। আর মানুষকে হাসানো খুব কঠিন কিছুও না। অসঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো কিছু করেই হাসির খোরাক হওয়া যায়। কারও অভিনয় দেখে যখন সিনেমা হল জুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে, হল থেকে মানুষ যখন চোখ মুছতে মুছতে বের হন অথবা সূক্ষ্ম কমেডিতে মানুষ আপনা থেকেই আনন্দ পান, যখন কোনো অভিনয় মানুষের মনে অনেকদিন পর্যন্ত দাগ কেটে যায়, তখনই তারকাদের আসল স্বার্থকতা।

এই জায়গায় জায়েদ খান, অপু কিংবা বুবলীরা কতটা সফল সে প্রশ্ন তোলাই যায়। তাদের সেই যোগ্যতা নেই, বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। যোগ্যতা না থাকলে তিনি ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা পেতেন না, চলচ্চিত্র শিল্পীদের বৃহৎ সংগঠনের নেতৃত্বেও আসতে পারতেন না। কিন্তু সেই গুণাবলী ও যোগ্যতা নিয়ে জায়েদ খান কেন এমন বদলে গেলেন? কেন তিনি সস্তা “ভাইরাল” মোহে মগ্ন হলেন? নিজেকে তিনি ক্রমেই নায়কের চেয়ে বেশি “কমেডিয়ান” হিসেবে উপস্থাপন করছেন?

প্রত্যেকের ব্যক্তি স্বাধীনতা রয়েছে, তিনি নিজেকে কীভাবে তুলে ধরবেন সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। জায়েদ খানেরও সেই স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যখন কোনো নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন তার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত। নইলে তার কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেই গোষ্ঠীটি। একজন তারকা সম্পর্কে জনসাধারণের মনে নেতিবাচক ধারণা পুরো শিল্পী সমাজের প্রতি একই মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। জায়েদ খানের তাই আরও কিছুটা সংযত হওয়া উচিত, কারণ তিনি শুধু একজন বিচ্ছিন্ন শিল্পী নন; তিনি বাংলাদেশের শিল্পী সমাজের একজন নেতাও।

তার প্রেমে কেউ পড়লে সেটি জায়েদ খান বলতেই পারেন, কিন্তু একই কথা বারবার কেন প্রকাশ্যে বলতে হবে? একই গান কেন বারবার গাইতে হবে? কেন তিনি নিজের পোশাক কিংবা ব্যবহার্য পণ্যের দাম বারবার ফলাও করে বলবেন? কেন তার বারবার পাবলিক প্লেসে ডিগবাজি খেয়ে দেখাতে হবে? কীভাবে চুমু খেতে হয় তা শেখাতে হবে? নারীরা কীসে আটকায় সেটি কেন বলতে হবে? কেন বারবার নিজের কমিউনিটির একজন নারী শিল্পীকে নিয়ে প্রকাশ্যে নেতিবাচক মন্তব্য করতে হবে? কেন তিনি নিজেই নিজের গুণগান নিজে গেয়ে বেড়াবেন?

কোনো ব্যক্তি তখনই স্বার্থক, যখন তিনি নিজে নন বরং অন্যরা তার প্রশংসা করেন। জায়েদ খান কি পারছেন অন্যের প্রশংসা কুড়াতে? হাসির খোরাক হওয়া আর প্রশংসিত হওয়া যে এক জিনিস নয়, সেটি যে কারোই বুঝতে পারার কথা। তাহলে জায়েদ খান কেন সেটি বুঝবেন না?

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গৌরবজ্জ্বল দিন ফিরেয়ে আনার দায়িত্ব এই খাতসংশ্লিষ্ট সবার। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জায়েদ খানের সেই দায়িত্বটা একটু বেশিই। জায়েদ খান নেতিবাচক উপায়ে আলোচনায় থাকার চেয়ে নিজের আসল কাজ অভিনয় দিয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন; চলচ্চিত্রপ্রেমী প্রত্যেকের সেটিই প্রত্যাশা। এজন্য জায়েদ খানের নিজেকেই সবচেয়ে বেশি বিবেচনা বোধসম্পন্ন হতে হবে। ভিউয়ের আশায় কেউ কেউ তাকে উস্কে দিতেই থাকবে, কিন্তু কোথায় থামতে হবে সেটি জায়েদ খানের নিজেকেই জানতে হবে। নিজে না থামলে অন্য কেউ তাকে থামাতে পারবে না। জায়েদ খানের বুঝতে হবে “ভাইরাল” সংস্কৃতি চিরস্থায়ী নয়, আজ যা ভাইরাল কাল সে জায়গায় অন্য কিছু ভাইরাল হবে। কিন্তু যা “ধ্রুপদি” তা ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

জায়েদ খান ভাইরাল কিংবা কমেডিয়ান নন; অভিনেতা হয়ে উঠবেন। কালজয়ী সিনেমার নায়ক হয়ে উঠবেন, সেটাই তার ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের চাওয়া।

শুধু জায়েদ খান নন, রুপালি পর্দার সব তারকাদের প্রকাশ্যে কথা বলার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকা উচিত, তাতে সামগ্রিকভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প।

মারুফ খলিফা, সাব-এডিটর, ঢাকা ট্রিবিউন
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x