শিল্পের নামে অখাদ্য, দূষণ আর ক্ষমতা তোষণের দেশে আমাদের একজন ফরীদি ছিলেন। অভিনয়ই করতেন তিনি। এর বাইরে কিছু নন। আমৃত্যু বাঁচতে চেয়েছেন পেশা অভিনয়কে ধারণ করে। সম্ভবও করেছেন তা। আবার পারেননি অনেক কিছু।
১৯৫২ সালের আজকের দিন ২৯ মে ঢাকার নারিন্দায় তার জন্ম। ৫৯ বছরের নশ্বর জীবন শেষে ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তার অনন্তলোকে যাত্রা। আমরা ইতোমধ্যে অতিক্রম করছি হুমায়ুন ফরীদিহীন ১০টি বছর। তার শূন্যতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন প্রকৃত শিল্পবোধ আছে যাদের তারা। অন্যদের কাছে ফরীদির দরকার নেই। তারা মেতে থাকতে পারেন শক্তিমান অভিনেতার বোহেমিয়ান জীবনের যত গসিপ নিয়ে।
অভিনয়ে দিয়ে নিজেকে উজাড় করা ফরীদির এ পথে হাঁটা কৈশোরে। ১৯৬৫ সালে বাবার চাকরি সুবাদে ছিলেন মাদারীপুর। এই মাদারীপুর থেকেই নাট্য জগতে প্রবেশ। তার নাট্যঙ্গনের গুরু তখন বাশার মাহমুদ। এই গুরুর নির্দেশনায় শিল্পী নাট্যগোষ্ঠী নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন কিশোর ফরীদি। কল্যাণ মিত্রের “ত্রিরত্ন” নাটকে “রত্ন” চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সর্বপ্রথম দর্শকদের সামনে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৬৮ সালে আবার স্থান বদল। বাবার চাকরির কারণে চাঁদপুরে ফরীদি। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন চাঁদপুর সরকারি কলেজে। পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব-রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। তখন আসে মুক্তিযুদ্ধের ডাক। ক্যারিয়ারের চিন্তা বাদ মাথা থেকে। পড়া অসমাপ্ত রেখে হুমায়ুন ফরীদি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু বিজয়ের পর ঢাকামুখী হন না। ফিরে এসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন অর্থনীতি বিভাগে। এখানে সবচেয়ে বেশি সখ্যতা হয় আজকের বাংলাদেশে প্রতিরোধের প্রতিশব্দ অর্থনীতিবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অ্যাকটেভিস্ট আনু মুহাম্মদের সঙ্গে। দু’জনই থাকতেন আল-বেরুনী হলের এক্সটেনশনে।
২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় আনু মুহাম্মদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “. . . ক্যাম্পাসে আসার পরই যার সঙ্গে প্রথম ও স্থায়ী বন্ধুত্ব, সে হলো এই ফরীদি। এমনিতে সে আমার চেয়ে বড় ছিল। কয়েক বছর গ্যাপ দিয়ে আবার অর্থনীতিতে ভর্তি হয়েছিল। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম। আমার হল পরিবর্তনেরও সে বড় কারণ। ওর আগ্রহেই এক্সটেনশনে চলে এলাম। ফরীদির বাসায় গেছি, ওর পরিবারের সঙ্গেও অনেক ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। পরীক্ষার সময় তো একসঙ্গেই পড়তাম। আমাদের চারজনের একটা গ্রুপ ছিল। আমি, ফরীদি, বাকি দুজনের একজন রুমমেট—ভূগোলের অধ্যাপক মঞ্জুরুল হক, আরেকজন কবি ফজল মাহমুদ।. . .”
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের আরেকটি স্মৃতিচারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র হুমায়ুন ফরীদির সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা অনুভব করা যায়- “. . .ওর কণ্ঠে আবৃত্তি শুনি, যাত্রার কিংবা নাটকের কিংবা চলচ্চিত্রের সংলাপ শুনি। গানও। রাতে-দিনে, লেকের পাড়ে, বসে, কিংবা হাঁটতে হাঁটতে। ওর জীবনকাহিনী বৈচিত্র্যময়; নাটকীয় এবং নাটককেন্দ্রিক। নাটক শিল্প নিয়ে ওর পড়াশোনা, চিন্তা, আগ্রহ ওকে প্রায় ধ্যানগ্রস্ত করে রাখত, কখনো কখনো অস্থির। সে সময় আমাদের অগ্রজ বন্ধুর মতো ছিলেন সেলিম আল দীন, মোহাম্মদ রফিক। আমাদের আড্ডায় প্রায় নিয়মিত উপস্থিতি ছিল তাদের। সেলিম ভাই তত দিনে নাটক রচনায় নতুন ধারা তৈরি করেছেন, রফিক ভাই কবিতায়। . . .”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে আজও রঙিন হুমায়ুন ফরীদি ঢাকা ট্রিবিউন
১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নাট্য উৎসবের অন্যতম সংগঠক ছিলেন হুমায়ুন ফরীদি। তিনি নাট্যাঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেন। জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রাবস্থাতেই তিনি ঢাকা থিয়েটারের সদস্যপদ লাভ করেন।
অভিনেতা ফরীদির যাত্রা এরপর ঊর্ধ্বমুখী। ১৯৮৪ সালে তিনি তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত “হুলিয়া” স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তিনি পা রাখেন ১৯৮৫ সালে শেখ নিয়ামত আলীর “দহন” ছবি দিয়ে। আশির দশকের শেষ দিকে ফরীদি বিটিভি অধ্যুষিত বাংলার ঘরে ঘরে। বিখ্যাত সংশপ্তক নাটকে “কানকাটা রমজানকে” ভুলে থাকার সাধ্য নেই কারও।
হুমায়ুন ফরীদি বারবার বলে গেছেন, “অভিনয় ছাড়া আর কিছুই পারি না।” এ দেশে মঞ্চে টাকা নেই। গুণী নির্মাতাদের ছবির সংখ্যা হাতেগোনা। তাও কম বাজেটের। কীভাবে তখন অভিনয় দিয়ে বাঁচবেন একজন? ফরীদিকে তখন বেছে নিতে হয় জনপ্রিয় ধারার, মূল স্রোতের অর্থাৎ এফডিসিতে নির্মিত চলচ্চিত্রকে। নিজের অভিনয় দিয়ে সিনেমা বদলের স্বপ্ন ছিল তার। ইন্ডাস্ট্রিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী খলনায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। অভূতপূর্ব সময় তৈরি করেন একক ফরীদি। নায়িকা নয়, নায়ক নন, খলনায়ক হুমায়ুন ফরীদির অভিনয়ের দাপটে সিনেমা হল ভরে যেত। হয়তো নাক উঁচুদের পছন্দ হয় না এ যাত্রা। কিন্তু ফরীদি ঠিকই অভিনয় দিয়ে হৃদয় জয় করেছেন কোটি মানুষের। অর্জন করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার। জীবিত গুণীর সম্মানহীন দেশে ভূষিত হয়েছেন মরণোত্তর একুশে পদকে।
সব বিচারে শিল্প আঙিনায় হুমায়ুন ফরীদিকে মনে হয় একাকী সংশপ্তক। একাই জীবন জুড়ে শিল্পের আঙিনায় অভিনয় দিয়ে তাকে লড়তে হয়। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ভাঙিয়ে দেশের বিরাজমান সংস্কৃতি জগতের পাণ্ডা হওয়ার কোনো বাসনা তার ছিল না। হয়তো আবৃত্তি নিয়ে হতে পারতেন আরও যত্নবান। আর্থিকভাবে সামর্থবান হওয়ার পর হয়তো মঞ্চে নিয়মিত হতে পারতেন। কিন্তু এর সবই হয়তোর আলাপ। ভীষণ টিমওয়ার্ক শূন্যতায় অভিনেতার একক কিছু করার থাকে না। স্পষ্টভাষী ফরীদি তাই চলেছেন নিজের ইচ্ছায়, নিজের জীবনে। সে জীবন নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে অনেকের। কিন্তু শক্তিমান অভিনেতার সীমাবদ্ধতার দিকও উপেক্ষা করা চলে না।
অনন্তকাল তিনি রইবেন কোটি হৃদয়ে। নিজস্বতার গুণে তার এ আসনের চারিধারে কেউ নেই। একক অভিনয় সক্ষমতা হুমায়ুন ফরীদিকে মনে করাবে চিরকাল। তার সময়ে বেঁচে থাকা আমাদের সাক্ষ্য এটুকুই।
লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



