১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওরে জন্ম। বেড়ে ওঠা পুরোনো ঢাকায়; লেখাপড়ার পাট চুকিয়েছিলেন উচ্চ মাধ্যমিকের আগেই। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনে যোগ দেন ছাত্রলীগকর্মী হিসেবে। একে একে ৩৭টা মামলার আসমি হন তিনি। ফেরারি হয়েই উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেরকর্মী মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে ঝাপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।
নাম না নিয়েই এতাক্ষণ যার কথা বলছিলাম তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, কিংবদন্তী অভিনেতা নায়ক ফারুক। পৈত্রিক নাম আকবর হোসেন পাঠান দুলু। পুরোনো ঢাকার দুলু গুন্ডা থেকে রাজনৈতিককর্মী অতপর দেশের প্রথম সারির একজন অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন নিজেকে। পেয়েছেন মানুষের অকপট ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। এইটুকু সম্বল নিয়েই অজানার পথে যাত্রা শুরু করলেন সিনেপর্দার চরিত্র থেকে বাস্তবের “মিয়া ভাই” হয়ে ওঠা এই গুণী শিল্পী।
চলচ্চিত্রে এসেছেন পাকিস্তান সরকারের একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা থেকে রেহাই পেতে। অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, নির্মাতা এইচ আকবর এবং বন্ধু ফারুকের পরামর্শে পৈত্রিক নাম পাল্টে নিয়েছিলেন ফারুক নাম। দুলু থেকে ফারুক হয়ে ওঠা এই কিংবদন্তী একদিন মহীরূহ হয়ে উঠবেন, তখন হয়তো অনেকেই ভাবতেও পারেননি।
এই নামেই চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই রূপোলী পর্দায় ১৯৭১ সালে মুক্তি পায় তার অভিনীত প্রথম ছবি “জলছবি”। বিপরীতে ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের “মিষ্টি মেয়ে” খ্যাত কবরী। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে খান আতা'র “আবার তোরা মানুষ হ” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নতুন করে পথচলা শুরু হয় তার, এরপর একে একে নারায়ণ ঘোষ মিতার “আলোর মিছিল” ও “লাঠিয়াল”; চাষী নজরুল ইসলামের “সুজন সখী” এবং “মিয়া ভাই”; আবদুস সামাদের “সূর্যগ্রহণ”; আবদুল্লাহ আল মামুনের “সারেং বৌ”; আমজাদ হোসেনের “নয়নমণি” এবং “গোলাপী এখন ট্রেনে”; প্রমোদ করের “দিন যায় কথা থাকে”; শেখ নিয়ামত আলীর “মাসুম” ইত্যাদি অসামান্য সব চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
তার দর্শকপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। বিশেষত ১৯৭৯ সালে এক বছরেই তার মুক্তি পাওয়া ৩০টি চলচ্চিত্র তাকে দুর্দান্ত জনপ্রিয় করে তোলে। গ্রামীণ পটভূমিতে কিছুটা লাজুক, কিছুটা একরোখা, সহজ সরল প্রেমিক কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদী চরিত্রে দর্শক তাকে প্রবলভাবে পছন্দ করে। ১৯৭৫ সালে “সুজন সখী” চলচ্চিত্র ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক, যেখানে গ্রামের সুদর্শন যুবক সুজনের চরিত্রে তার বিপরীতে ছিলেন কবরী। এই সিনেমার “সব সখীরে পার করিতে নেব আনা আনা” গানে ফারুকের অভিনয় এবং কবরীর সাথে তার পর্দারসায়ন এখনো মানুষের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে।
আরেকটি গানের চিত্রায়ণের জন্য অমর হয়ে আছেন তিনি। সেটি হচ্ছে ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র “সারেং বৌ” চলচ্চিত্রের “ওরে নীল দরিয়া, আমার দে রে দে ছাড়িয়া” গানটি। চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র নারীকেন্দ্রিক হলেও অসামান্য অভিনয়ে দর্শককে স্তব্ধ করে দেওয়া ফারুকের ক্যারিয়ারে এবং বাংলা চলচ্চিত্রে এই সিনেমাটি ছিল ক্ল্যাসিক। আর গানটিতে ফারুকের অভিনয় আজো ব্যথাতুর করে দর্শকদের। দেশান্তরে থাকা প্রেমিকপুরুষ কিংবা বিরহে থাকা প্রেমিক হৃদয়ে আজও গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে এই গান, আলোচিত হয় এই চলচ্চিত্র।
১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়া তার অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে “নাগরদোলা”, “দিন যায় কথা থাকে”, “ঘরজামাই”, “এতিম”, “ভাইভাই”, “জনতা এক্সপ্রেস”, “মাটির পুতুল”সহ বেশ কয়েকটি ছবি বাণিজ্যিক সফলতা পায়। পর্দায় তার অভিনীত “দিন যায় কথা থাকে”, “তুমি আরেকবার আসিয়া” ইত্যাদি গানগুলো প্রবল জনপ্রিয়তা পায়।
১৯৮৭ সালে “মিয়া ভাই” চলচ্চিত্রে তার অভিনয় এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে এরপর থেকে তিনি মিয়া ভাই হিসেবে পরিচিত হন সর্বত্র। সুচন্দা, শাবানা, কবরী, ববিতা, রোজিনা, অঞ্জনা, সুচরিতাসহ চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী ও জনপ্রি অভিনেত্রীদের সঙ্গে পর্দা শেয়ার করেছেন তিনি। জনপ্রিয়তার বিচারে ফারুক-কবরী এবং ফারুক-ববিতা জুটিই এগিয়ে ছিলেন সবার চেয়ে।
একশোর উপরে চলচ্চিত্রে অভিনয় করা ফারুক মুক্তিপ্রাপ্ত “লাঠিয়াল” চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে না থাকলেও দুর্দান্ত অভিনয়ে জিতে নেন সেই বছরের পার্শ্ব চরিত্রে সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার। এছাড়া বাংলা চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ৪১তম আসরে (২০১৬) তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দেওয়া জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা কিংবদন্তী অভিনেতা আকবর হোসেন পাঠান দুলু ওরফে ফারুক ওরফে মিয়া ভাইয়ের প্রতি অতল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
এই লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এ লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো দায় নেবে না।
লেখক: গবেষক, কলামিস্ট



