সময় কাটছে গ্যাজেটে। কী খুঁজছি আমরা তাও যেন অজানা। আঙুল ব্যস্ত থাকছে স্ক্রলিংয়ে। অবসরে ঘরে কিংবা শহরের রাস্তায় জ্যামে বসে এই আমাদের ‘‘বিজি’’ থাকা। এর মধ্যে বদলেছে বহু কিছু। বিলীন হয়েছে সমাজের বহমান সংস্কৃতির নানা উপাদান। আর অপরিকল্পিত উন্নয়নে শহর মানে তো এক নাভিশ্বাস।
সব্যসাচী সৃষ্টিশীল প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হকও ঢাকার এমন বদলে যাওয়ায় বিস্মিত হয়েছিলেন। কবিতায় লিখেছেন তাই এমন -
“ কী নাম এ শহরের ? কারা থাকে এইসব ডিজাইনড বাড়িতে?
আজকাল প্রত্যেকের নামের পেছনে কেন এত ডাক নাম?
মানুষের হাসিটি এখন হঠাৎ হর্নের মতো কেন মনে হয় কবিতার মধ্যরাতের সময়ে?
টয়োটার মিৎসুবিশির ভিড়,
মরিস মাইনরগুলো ডিনোসোরাসের মতো মাটি চাপা পড়ে গেছে;
বুজে গেছে দোলাই কানাল; . . . ”
-( ঢাকায় প্রথম বসতি , আমার শহর কবিতার বই থেকে)
মেগাসিটি হয়ে বহু কিছু হারিয়েছে ঢাকা। সে তালিকা দীর্ঘ। এখনের প্রহরে শুধু উল্লেখ করা যায় পবিত্র রমজান মাসে শহরের ঐতিহ্যবাহী ‘কাসিদা’ সঙ্গীতের কথা। এক সময় ঢাকায় পবিত্র এ মাসে সেহরির সময় মহল্লায় মহল্লায় কাসিদা গাওয়ার দৃশ্য স্বাভাবিক ছিল। ছিল না এখনের মাইকবাজি। প্রতিপালকের প্রতি নিবেদিত আধ্যাত্মবাদী সঙ্গীতের সুরে শেষ রাতে ঘুম ভাঙত রোজাদারদের।
‘‘কাসিদা’’ মূলত আরবি শব্দ। বাংলায় এর অর্থ প্রশংসা বাণী বা প্রশস্তিমূলক কবিতা। ধর্ম হিসেবে ইসলামের প্রচার লাভের আগেই এর শুরু। আরবি সাহিত্যের বিপুল একটি অংশ জুড়ে আছে এর ভাণ্ডার। আরবি ভাষার পরে ফারসি, তুর্কি ও উর্দু ভাষায় কাসিদা বিস্তৃত হয় জনপদ থেকে জনপদে।
বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁর সেনাপতি মির্জা নাথনের মুঘল অভিযানের বর্ণনামূলক ‘‘বাহারিস্থান-ই-গায়েবী’’ বইয়ে আছে এর উল্লেখ। এতে মুঘলদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় কাসিদা চর্চার ইতিহাস পাওয়া যায়।
এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত ‘‘ঢাকা কোষ’’ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ রয়েছে, “...নবাবি আমলে ঢাকা শহরের প্রায় প্রতিটি মহল্লার সর্দাররা কাসিদা দলের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ঢাকার নবাব আহসান উল্লাহর সময় কাসিদা গাওয়ার ব্যাপক প্রসার ঘটে। নবাব নিজেও কাসিদা রচনা করতেন। আহসান উল্লাহর রচিত উর্দু কাব্যগ্রন্থ ‘কুল্লিয়াতে শাহীন’ এর নজির মেলে।”
কিছুকাল আগে উর্দু কাসিদা গাওয়ার চল থাকলেও নবাবি আমলে গাওয়া হতো ফারসি ভাষায় কাসিদা।
ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার বিখ্যাত বই ‘‘ঢাকা: স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী’’ তে লিখেছেন, ১৯৪৭-এর পর উর্দুভাষী মোহাজেররা ঢাকায় এসে কাসিদায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। পুরোনো ঢাকার মহল্লায় মহল্লায় ভোররাতে কাসিদা গায়কেরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়তেন। গান গেয়ে ঘুম ভাঙাতেন। একে সওয়াবের কাজ মনে করতেন তারা। আর ঈদের দিন মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নজরানা নিয়ে আসতেন।
তবে ঢাকায় প্রথম কাসিদা শুরুর সময় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ মনে করেন, মুঘল আমলে শুরু হলেও ইংরেজ আমলে এসে তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে ঢাকার ইতিহাস চর্চায় পথিকৃত ব্যক্তিত্ব হাকিম হাবিবুর রহমানের ধারণা, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে হয়তো আবার কাসিদার প্রচলন ঘটে।
কাসিদার ছিল নানা ধরণ। এর মধ্যে উল্লেখ করা যায়- চানরাতি আমাদ, খুশ আমদিদ, আলবিদা, ঈদ মোবারক। রোজার শুরুতে এ মাসের ফজিলত বর্ণনা করে যে কাসিদা গাওয়া হতো এটি পরিচিত ‘‘চানরাতি আমাদ’’ নামে। প্রথম ১৫ রোজা পর্যন্ত মহিমান্বিত মাসকে স্বাগত জানিয়ে গাওয়া হতো ‘‘খুশ আমদিদ’’। তারপর ‘‘আলবিদা’’ বা বিদায় পর্ব। এটি চলত ২৭ রমজান পর্যন্ত। ঈদের পরদিন ছিল ‘‘ঈদ মোবারক কাসিদা’’।
কাসিদার নানা সুর সম্পর্কেও জানা যায়। এর মধ্যে ছিল মর্সিয়া, নাত-এ রাসুল, রাগ ভৈরবী ও রাগ মালকোষ। কোরাস আবহে গাওয়া ছিল কাসিদার ঐতিহ্য।
মাত্র কয়েক বছর আগেও সংবাদমাধ্যমে ঢাকার কাসিদা প্রতিযোগিতার খবর প্রকাশ হতো। এখন তা ম্রিয়মান। তবে পুরনো শহরের অল্প কিছু জায়গায় এর প্রচলন না থাকার মতো হয়ে টিকে আছে।
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক অনার্য মুর্শিদ এর আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র ‘‘কাসিদা অব ঢাকা’’ নিয়ে এক লেখনীতে এ বিশেষ ধারার সঙ্গীত নিয়ে ওপার বাংলা বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক মৌসুমী ভৌমিকের মতামত জানা যায়।
তিনি লিখেছেন, “এত বছর ধরে ঢাকায় যাই, এমন গান যে ঢাকা শহরেই হয়, জানতাম না তো কই? অবশ্য আমি ঢাকায় যাই বলেই ঢাকাকে চিনি, এমন তো আর নয়। আমার দৌড় কত আর দূর? আমরা ঘুরে বেড়াই আমাদের চেনা আবর্তের ভিতরেই। . . .কিন্তু এই কাসিদা গানের কথা এই ফিল্ম থেকেই জানলাম প্রথম। এই গান হারিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাবার পথে, তার সব কারণ খুব যে স্পষ্ট করে উঠে এসেছে এই প্রামাণ্যচিত্রে, তা হয়ত নয়। ধর্মের কড়াকড়ির কথা বলেছেন একজন, কিন্তু আমার ধারণা ভাষার আধিপত্যও একটা কারণ হয়তো। এই গান হারিয়ে যাবার কারণ হিসেবে বিবর্তিত সমাজে একটা ভাষাগোষ্ঠির ক্রমশ সংকুচিত হবার বাস্তবতাও নিশ্চয় কাজ করেছে। যথার্থ রসিক শ্রোতা ছাড়া গান বাঁচে না। ফলে, গান হারিয়ে যাওয়া মানে শ্রোতার অবলুপ্তিও নিশ্চয়? এইসব কথা মনে হচ্ছিল এই প্রামাণ্যচিত্রটি দেখতে দেখতে। একটা ফিল্ম তখনই সার্থক হয় যখন তা প্রশ্ন জাগায়। একই শহরের ভিতরে অনেক শহর থাকে। ঢাকা শহরে অনেক রকমের গান, সুর আর তার ভিতরে এক দীর্ঘ দিন ধরে গড়ে ওঠা মিশ্র সমাজের ইতিহাস ধরা আছে। পরিচালক যাঁদের ইন্টারভিউ করেছেন, অনেকেই স্পষ্ট বাংলা বললেও, তাঁদের গায়নের ভিতরে এক অন্য মানচিত্র আর উত্তরাধিকার শুনতে পাওয়া যায়। . . .”
ক্ষীণ হতে হতে ঐতিহ্যের কাসিদা সংস্কৃতিহীন বলা যায় এখনের শহরকে। আমাদের জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ নিমগ্ন ওয়াজে। লেখার শুরুতে বর্ণিত সেই গ্যাজেট দ্বারাই। বিস্ময় নিয়ে দেখতে পাই তাতে ফতোয়া হয়, বহু কিছু হয়, প্রশ্নও হয় এমন- ‘‘সঙ্গীত হালাল না হারাম?’’
অথচ ১৮৪০ সালে ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার কর্নেল ডেভিডসন ঢাকায় এসেছিলেন। তার রোজনামচায় এ শহরের বিবরণ লিখেছেন। দিনে রাতে ঢাকায় বেহালার শব্দ শোনা যেত। ঢাকাবাসীকে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘‘মিউজিক্যাল পিপল’’ হিসেবে। হৃদয়নাথ মজুমদার নামে ঢাকার এক আইনজীবী উনবিংশ শতকে তার স্মৃতিকথায় শহরের সেতার ও তবলা ঘরানার বন্দনা করেছেন। ইন্দ্রবালা ঢাকায় গান গাইতে আসার আগে কালীঘাটের মন্দিরে প্রার্থনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “মা ঢাকা যাচ্ছি। ঢাকা তালের দেশ।. . মান রাখিস মা । ”
পেছনের কথা মনে করলে হাহাকার আর হারাবার অনুভূতিই বেশি জাগবে। অতীত ধুয়ে, মুছে, গুঁড়িয়ে নতুনের নির্মাণ চলে না। যদি চলেও তা খপ্পড়ে পড়বে পেছনে টানা মানুষে মানুষের ভেদের অপশক্তির হাতে। অন্য অনেক কিছুর মতো কাসিদা সংস্কৃতিহীনতা এ সত্যকেই মনে করায়।
লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



