আজ ১ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে দলটি। ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতার বাইরে দলটি। এই দীর্ঘ সময়ে নানা চড়াই-উতরাই পার করতে হয়েছে দলটিকে। হামলা, মামলা, নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে দলটির শীর্ষ থেকে তৃণমূলের প্রায় সব নেতাদের। বলতে গেলে রাজনীতির মাঠে এই ১৮ বছর পুরোটা সময় ধরেই ফাউলের শিকার হয়েছে দলটি। কিন্তু মাঠ ছেড়ে না যাওয়ায় গোলমুখে এসে পৌঁছানোর সুযোগ এসেছে তাদের সামনে। সেইসঙ্গে শঙ্কা গোলবঞ্চিত হওয়ার। সারা মাঠে ফাউলের শিকার হওয়ার বেদনার চেয়ে গোলমুখে এসে ব্যর্থ হওয়ার বেদনা বেশি বৈকি!
টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পতন ঘটেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করে দলটি। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যার প্রতিটিই ছিল বিতর্কিত। ছিল না সব দলের সমান সুযোগ নিয়ে অংশগ্রহণ। ভেঙে পড়েছিল গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও “ইলেকশন” এর চেয়ে “সিলেকশন” হয়ে উঠেছিল মূখ্য। তাই দৃশ্যমান অনেক উন্নয়নের পরও ক্রমেই আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর এই পুরোটা সময় গণতন্ত্রের দাবিতে অন্যসব রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থেকেছে বিএনপি। দলের চেয়ারপার্সনের অসুস্থতা ও কারাবরণ; ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্বাসনের ফলে দলটির যেখানে নেতৃত্ব শূণ্যতায় ভোগার অবস্থা; তখন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রুহুল কবির রিজভীর মতো পরীক্ষিত নেতারা চালিয়ে গেছেন লড়াই। আর তাদের সেই লড়াইয়ের পথ ধরেই যে ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান সেটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি তাদের এই দীর্ঘ আন্দোলনের সুফল ঘরে তুলতে পারবে? বিষয়টি নিয়ে যে খোদ বিএনপির মধ্যেই শঙ্কা রয়েছে, সেটি আর স্পষ্ট করার কিছু নেই। ইতোমধ্যেই তারেক রহমান এবং মির্জা ফখরুলরা বলেছেন, দেশে-বিদেশে বিএনপিকে নিয়ে “ষড়যন্ত্র” শুরু হয়েছে। যদি তারা সেটি বুঝতেই পারে, তাহলে বদলে যাওয়া এই ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই “ষড়যন্ত্র” মোকাবিলায় তারা কতটা প্রস্তুত?
বিএনপির ক্ষমতার বাইরে থাকা এই ১৮ বছরে একটা নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। এই প্রজন্মের তরুণেরা এখন আর কেউ নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক নন; বরং তারা এখন বিশ্ব নাগরিক। পাশাপাশি দীর্ঘ এই সময়ে পরিবর্তন এসেছে মানুষের মনোজগতেও। তারা এখন অপরাধীর শাস্তি চায়; কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি চায় না। তারা এখন উন্নয়ন চায়; কিন্তু উন্নয়নের নামে কারো পকেট ভারি হতে দেবে না। তারা এখন আর দখলবাজী, হামলা, লুটতরাজ, সন্ত্রাসের রাজনীতি চায় না।
যে ষড়যন্ত্রের কথা বিএনপি নেতারাও বলছেন, সেই ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে হলে দলটির এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন। আর সেজন্য তাদের বুঝতে হবে মানুষের মনোজগতের পরিবর্তনকে। মানুষ এখন আর ক্ষমতার পালাবদল মানে শুধু মুখের বদলের বিশ্বাসী নয়। তাই এখন বদলাতে হবে পুরো অভ্যাসকেই। কিন্তু বিএনপি সেই অভ্যাস কতটা বদলাতে পেরেছে? সরকার পতনের পর বিভিন্ন এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজীর যত অভিযোগ উঠেছে তার বেশিরভাগের সঙ্গেই এসেছে বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম। যদিও এসব ঘটনায় দলটির নেওয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপও বেশ প্রশংসনীয়। তবে সেই শাস্তি শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না, কারণ এখনকার প্রজন্ম অনেক বেশি চোখ-কান খোলা রেখে চলে। তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে আগের চেয়ে ইদানিং অনেক বেশি পরিণত মনে হয়েছে। আশা করাই যায় যে, যদি তিনি তার এখনকার এই পরিণত মানসিকতা ধরে রাখতে পারেন, তাহলে সেটি অবশ্যই জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে। পাশাপাশি যেকোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনার সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের না জড়ানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে।
একইসঙ্গে ভোটের মাঠের লড়াইয়ে প্রস্তুতি হিসেবে তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত ঢেলে সাজাতে হবে। পদ কিনতে কে কত বেশি টাকা দিতে পারেন, কিংবা কার কত ক্যাডার আছে; সেই বিবেচনার বিপরীতে গিয়ে মানুষের চিন্তার পরিবর্তনের এই ধারাকে ভালো বুঝতে পারেন এমন নেতাকর্মীদের দলীয় পদ দিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকেও বিশেষ গুরত্ব দিতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের আস্থা অর্জনে বিএনপির জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে তাদের ছাত্র সংগঠন “ছাত্রদল”। তবে এক্ষেত্রে জেলা, উপজেলা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় কমিটিতে যারা ছাত্রদলের নেতৃত্বে রয়েছেন তারা এই “জেন-জি” এর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সেটিও ভেবে দেখতে হবে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসালামী হতে যাচ্ছে আগামী নির্বাচনে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। আর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত প্রায় একমাসে মাঠের রাজনীতির পাশপাশি মানুষের মনোজগতের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে বেশ গোছানো মনে হয়েছে। আর এই অবস্থায় তাদের সঙ্গে রাজনীতির মাঠের লড়াইয়ে যদি বিএনপি কোনোভাবে পেশিশক্তির ওপর প্রাধান্য দিতে চায় সেটি এই ২০১৪ সালে এসে হবে নিঃসন্দেহে চরম ভুল। বিএনপিকে অবশ্যই এখন মেধা দিয়ে রাজনীতি করতে হবে। সঙ্গে এটিও মাথায় রাখতে হবে যে, আগামী দিনের রাজনীতিতে তাদের “নন্দঘোষ” বানানোর চেষ্টা চলতে পারে। সেটি মোকাবিলার জন্যও পেশিশক্তি নয়; নির্ভর করতে হবে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর।
পাশাপাশি এটিও মাথায় রাখতে হবে যে, যদি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধ হয় তাহলে আওয়ামী লীগের এমন ভরাডুবির প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয় এমন মানুষের কাছে বিকল্প পছন্দ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বিএনপির সামনে। তবে, মানুষ আওয়ামী লীগের পরিবর্তে কেবল বিএনপিকেই বেছে নেবে এমনটি ভাবারও কোনো সুযোগ বদলে যাওয়া এই প্রেক্ষাপটে এসে আর ভাবার সুযোগ নেই। বরং তাদের সামনে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেটি কাজে লাগাতে হলে বদলে ফেলতে হবে নিজেদের মানসিকতা, বদলাতে হবে প্রতিহিংসার রাজনীতির চিরায়ত ধারা, বদলাতে হবে পেশিশক্তির নির্ভরতা, বিশ্বাস করতে হবে গণমানুষের চিন্তা-চেতনায়। বের হয়ে আসতে হবে ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার অভ্যাস থেকে।