আইনজীবীদের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার বা সামাজিক প্রকৌশলী বলা হয়ে থাকে। এই সামাজিক প্রকৌশলীদের বর্তমান কার্যক্রম অনেকাংশেই সমাজ পরিবর্তনের পরিবর্তে স্বার্থসংশ্লিষ্ট হয়ে উঠেছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে সব অপবাদের ঊর্দ্ধে উঠে আইন পেশাকে যুগোপযোগী করতে সব অংশীজনের মুখ্য ভূমিকা এখন পালন করা প্রয়োজন। সম্মানিত প্রধান বিচারপতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন রকম সংস্কারের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাহত হওয়ার ক্ষেত্রে আইনজীবীদের ভূমিকা ভুলে গেলে চলবে না, তাই এক্ষেত্রেও সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নাহলে ২০২৪ এর মতো সাধারণ জনগণ হয়তো কোনো একদিন আদালতের বিরুদ্ধেও জেগে উঠবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। যা কখনোই কাম্য নয়।
বাংলাদেশে ন্যায়বিচার ব্যর্থ হওয়ার পেছনে আইনজীবীদের দায় অস্বীকার করার উপায় নেই। বার কাউন্সিল অর্ডার সংশোধন করে ন্যায় বিচারের স্বার্থে সব ধরনের রাজনীতি বন্ধ করা উচিত। নষ্ট রাজনীতির কারণে তারা জাতীয় স্বার্থে কখনো এক হতে পারেনি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে। যার কারণে এখন সর্বোচ্চ আদালত থেকে শুরু করে নিম্ন আদালতেও বার সমিতির নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন না করে পদ ভাগাভাগি করছেন, চোখ রাঙানো থেকে শুরু থেকে গুন্ডামিতে পর্যন্ত আইনজীবীরা এখন যুক্ত হচ্ছেন, যা সংবাদমাধ্যমগুলো খুললেই নজরে আসে। বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিষোদগারে তারা ব্যস্ত যা সামাজিকমাধ্যমে নজর দিলেই চোখে পড়ে। এর থেকে অনুমেয় অদক্ষ আইনজীবী দ্বারা চলছে আদালত পাড়া। যার দায়বহন করছে পুরো জাতি।
বার কাউন্সিল অর্ডারে যেখানে আইনজীবীদের ব্যবসা করা, চাকরি করায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে, সেখানে সমিতিগুলো হয়ে উঠেছে ব্যবসা কেন্দ্র। তারা বিচারিক কার্যক্রমের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেয়ে এখন চেম্বার ভাড়া, দোকান ভাড়া, আইনজীবীদের ফান্ড নিয়ন্ত্রণ এবং তসরূপ করা নিয়ে অতিউৎসাহী। যার কারণে সম্প্রতি প্র্যাকটিশনার আর নন প্র্যাকটিশনার নামে বিভাজন তৈরি করে, ব্যবসায়ী আইনজীবীদের বাদ দিয়ে শুধু চাকুরীজীবী আইনজীবীদের লক্ষ্যবস্তু করে তাদের সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে । অথচ বার কাউন্সিল অর্ডারের কোথাও প্র্যাকটিশনার আর নন প্র্যাকটিশনার শব্দগুলো নেই; সেখানে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে বেতনভুক্ত, ব্যবসায় জড়িত আইনজীবী এবং সাধারণ আইনজীবী হিসেবে। বার কাউন্সিল অর্ডার লঙ্ঘন করে চট্টগ্রাম বার একটি পক্ষপাতমূলক প্র্যাকটিশনার আর নন প্র্যাকটিশনার সঙ্গা দিয়ে অর্ডার জারি করেছে ২০২৪ এর নভেম্বরে, যা বার কাউন্সিল অর্ডারে প্রদত্ত ক্ষমতার এখতিয়ার বহির্ভূত অন্যায় কাজ। এই মর্মে আইন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত এবং উচ্চ আদালতের রায় অতিপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
বিভাজনের ক্ষেত্রে আদালত পাড়ায় কয়জন সত্যিকারের কোর্ট প্র্যাকটিশনার আছে তাও বিবেচনায় আনা উচিত। বেশিরভাগ আইনজীবীরাই বিচার প্রক্রিয়ায় জড়িত হওয়ার চেয়ে তারা অন্যান্য কার্যক্রম যথা, ড্রাফটিং, রেজিস্ট্রি, সার্ভে, ব্যাংকের মর্টগেজের মতামত প্রদান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এমন অনেক সিনিয়র আইনজীবী আছেন যারা কখনো কোর্টেই যান না। তাদের কর্মকাণ্ড অনেকাংশে সলিসিটরদের কাজের অনুরুপ।
অধিকন্তু, বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং তার আইনজীবী কর্মকর্তাবৃন্দ যেখানে সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত সরকারি বেতনভুক্ত একটি পদ, সেখানে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার সংবিধান এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক । তাছাড়া যেকোনো বৈধ পেশা, কর্ম গ্রহণ করা সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের অন্য কোন পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে যেমন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এই ধরনের বাধা প্রদান করা হয়নি, আইনজীবীদের চাকরিজীবী এবং ব্যবসায়ী নাম দিয়ে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা সংবিধান লঙ্ঘন।
তাছাড়া, আইন ব্যবসা ২০২৫-এ এসে ১৯৭২ এর অবস্থায় নেই। আইনের দক্ষ একজন ব্যক্তি আইনজীবী হওয়ার পাশাপাশি তার এখন অনেক ধরনের আইন সম্পর্কিত কর্মে জড়িত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষকতা থেকে শুরু করে মানবাধিকার কর্মী, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি জাতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে আইন উপদেষ্টা, গবেষক, লেখক, বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাডভোকেট হিসেবে, জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে আইনজীবীদের আরও নানাবিধ কাজে জড়িত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আইন সম্পর্কিত পদগুলোতে চাকরির একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হচ্ছে অ্যাডভোকেট হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া। তাছাড়া উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগের ক্ষেত্রে, প্রধানত পদ্ধতিগত আইনের শিক্ষা প্রদানের জন্য, অ্যাডভোকেটদের বর্তমানে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে আদালত পাড়ায় এই বিশৃঙ্খল পরিবেশ বন্ধ করতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার সংশোধন অতিপ্রয়োজনীয়। আশা করি আইন মন্ত্রণালয়, উচ্চ আদালত এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, এই মর্মে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।