আগামী জাতীয় নির্বাচন, সরকারবিরোধী আন্দোলন, সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ও দুর্বলতা, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ সাম্প্রতিক নানা বিষয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের নওয়াজ ফারহিন অন্তরার সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপির একমাত্র নারী সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তার সাক্ষাৎকারটি তুলে দেওয়া হলো-
নির্বাচনের এখনো প্রায় ১৫-১৬ মাস বাকি। বিএনপিকে এখন সমসাময়িক ইস্যুতে বেশ সরব দেখা যাচ্ছে। পুলিশের বাধার মুখোমুখিও হতে হয়েছে আপনাদের। সামনের দিনগুলোতে কি সংঘাত আরও বাড়বে?
আমি মনে করি সরকার ও ক্ষমতাসীন দল মিলে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে পুরো বিষয়টিকে সংঘাতে পরিণত করছে। জনগণের উদ্বেগের বিষয়গুলোকে চাপা দিতে সারাদেশে আন্দোলন শুরু করেছে বিএনপি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎসংকট এবং জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের প্রতিবাদে বিএনপি কর্মসূচি নিয়েছে।
বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো উসকানিমূলক স্লোগান দেয়নি বা উসকানিমূলক আচরণ করেনি। আমি নিজেও অনেক প্রতিবাদে অংশ নিয়েছি। এসব শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। পুলিশের গুলিতে আমাদের তিনজন কর্মী নিহত হয়েছেন। এ জন্য পুলিশকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়নি। এমনকি আজ পর্যন্ত তদন্তও হয়নি।
এছাড়া, আমাদের সমাবেশে আসার কারণে বিএনপি নেতাকর্মীদের মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। সারাদেশে ৪ হাজার নেতার নাম উল্লেখ করে প্রায় ২০ হাজার অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এটি মতপ্রকাশ, সমালোচনা এবং প্রতিবাদের স্বাধীনতার সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।
গত কয়েক বছর ধরে মাঠে নেই বিএনপি। অনেক নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এখন কীভাবে মাঠের কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন আপনারা?
একটি দল ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় নেই, দলটি বিলুপ্ত হওয়ার কথা। এই সময়ের দধ্যে দল ভাঙেনি বা বিভক্ত হয়নি; উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা অন্যকোনো দলে যোগ দেননি। রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও আমরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। জনগণের সমর্থনই আমাদের সাফল্য, যা আমরা এবার জনসভায় দেখেছি।
এর জন্য সংবাদমাধ্যমকে ধন্যবাদ দিতে হয়। যদিও সংবাদমাধ্যমগুলো সরকারের নানারকম চাপের মুখে রয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আছে, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে; তবুও তারা রাজনৈতিক ইস্যু ও নির্যাতন নিয়ে লিখছে।
সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, নীতি ইত্যাদির মূল্যায়ন ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য ছায়া সরকার হিসেবে কাজ করার জন্য বিএনপির কোনো কমিটি আছে কি?
ছায়া সরকার একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, এবং কোনো স্বৈরাচারী সরকারের ছায়া সরকার নেই। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের বক্তৃতা, বক্তব্য, কলাম এবং টকশোর মাধ্যমে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তা নেওয়ার মানসিকতা তাদের (সরকারের) নেই।
আওয়ামী লীগ সরকার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি মেনে নেবে বলে কি মনে করেন?
আওয়ামী লীগ সফলভাবে দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। এটি সারা দেশে প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং আইন ও বিচার ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করেছে। এখন বিরোধী দলগুলোর তীব্র আন্দোলনের মুখে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা উচিত। নাকি জনগণ তাদের অধিকার আদায় করবে তা সময়ই বলে দেবে।
আগামী নির্বাচনে বিএনপি কয়টি আসন পেতে পারে?
আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বিএনপি তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করবে। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত ও প্রতিষ্ঠা করতে এখন সমমনা দলগুলোর সংঘবদ্ধতা জরুরি। বর্তমানে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য এই অনির্বাচিত সরকারের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করা। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকারের প্রশ্নে যেকোনো সমমনা ব্যক্তি বা দলকে আমরা স্বাগত জানাবো; তারা আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।
গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মতো নানা বিষয়ে প্রতিনিয়ত সমালোচনা করছে বিএনপি। বিএনপি সরকার এসব সমস্যার সমাধান কীভাবে করবে?
সুষ্ঠু ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে সরকার যেই হোক জনগণের নির্বাচনের দিকে ফিরে যেতে হবে। কেউ দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করলে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিএনপি ক্ষমতায় এলে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে?
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। আমরা সিপিডির সভায় বোমা হামলা, উদীচী অনুষ্ঠানে বোমা হামলা এবং রমনা বটমূলে বিস্ফোরণ দেখেছি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই উত্থান ঘটেছিল, তারা তা বন্ধ করেনি। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপির আমলে কিছু ঘটনা ঘটেছে। বাংলা ভাইয়ের বিচার হয়েছে আমাদের সরকারের আমলে। এরপর ২০১৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ব্লগার, বিদেশি নাগরিক, এলজিবিটি হত্যার কোনো বিচার হয়নি। সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিনিয়ত ঘটছে। যখন বিচার হবে, অপরাধীরা এসব করতে ভয় পাবে এবং এসব অপরাধ বন্ধ হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফর এবং মোদি সরকার নিয়ে বিএনপির প্রতিক্রিয়া কী?
আমরা প্রতি নির্বাচনের আগে একবার ভারত সফর দেখি। দেশের মানুষ আশা করে তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে, বাণিজ্য বৈষম্য দূর হবে, নয়তো আমরা আমাদের ট্রানজিটের বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে কিছু পাব। আমরাও আশা করি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত আমাদের পাশে থাকবে, মিয়ানমারের পক্ষে নয়। আমরা আরও আশা করি ভারত এনআরসি নিয়ে আমাদের ভয় দেখাবে না এবং আমাদের লোকেরা ভারতের শ্রমবাজারে সুযোগ পাবে। ভারত সামগ্রিকভাবে তার স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এটা সরকারের ব্যর্থতা যে তারা আমাদের স্বার্থের দিকে খেয়াল রাখেনি।
রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও প্রত্যাবাসন নিয়ে বিএনপির অবস্থান কী? কীভাবে তাদের দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যাবে?
রোহিঙ্গা সমস্যা জিয়াউর রহমানের আমলেও একবার হয়েছিল, যখন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তাদের যথাযথভাবে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল। এরপর তিনি কঠোর অবস্থান নিয়ে মিয়ানমারকে সতর্কও করেন। মিয়ানমার যদি কোনো রোহিঙ্গা পাঠায়, আমরা তাদের পূর্ণ জবাব দেব। খালেদা জিয়াও তার মেয়াদে সফল প্রত্যাবাসন দেখেছেন।
সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ব্যর্থ হয়েছে; কারণ তারা কিছু দেশী ও বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভরশীল এবং চীন তাদের মধ্যে একটি। এই সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ ছাড়বে না।