অনলাইন রাজনীতিতে বিরোধীদের চেয়ে পিছিয়ে আওয়ামী লীগ

১৪ বছর ধরে বাংলাদেশে সরকার পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ। এই সময়ে বারবার রাজনৈতিক বিরোধীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও সরকারি দলটি সেগুলো কৌশলে উৎরে গেছে।

তবে অনলাইনের রাজনীতিতে অনেকটাই পিছিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বিরোধীরা রাজপথে সরব থাকার পাশাপাশি প্রচারণা বাড়িয়েছে অনলাইনেও। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বরাবরই ব্যস্ত ছিল রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ছবি দিতে, জাতীয় কাউন্সিল ও বিভিন্ন কমিটির পোস্ট করতে। দলের তৃণমূলকে অনলাইন ও অফলাইনে শক্তিশালী করতে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা দলের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে, বিভিন্ন আন্দোলনের সময় মূলধারার সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের পাশাপাশি বিরোধী কর্মীরা স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার করে ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইটে সরব ছিল।

অনলাইন প্রচারাভিযানের মধ্যে রয়েছে ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ এবং ইউটিউব চ্যানেলে খবরের চ্যানেল পরিচালনা, মূলধারার সংবাদপত্রের অনলাইন ভোটে অংশ নেওয়া, সংবাদের লিংকে মন্তব্য করা, সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পর্কিত ব্যাঙ্গাত্মক ছবি ও লেখা প্রচার করা।

অক্টোবর পর্যন্ত বিএনপির শীর্ষ নেতারা সরকারের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ সমসাময়িক বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করেছেন। দলটির কর্মীরা নেতিবাচক খবর তুলে ধরে সরকারের সমালোচনা ও উপহাসের জন্য অনলাইনে শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রেখেছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকারকে অপবাদ দিতে মিথ্যা বা অর্ধ-সত্য তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিরোধী সমর্থকদের দায়ী করা হয়েছিল।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গুজব ছড়ায় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছেন। এতে ব্যাংকগুলো গুরুতর নগদ অর্থের সংকটের সম্মুখীন হয়েছে।

প্রশ্নবিদ্ধ সরকারের অর্জন

দশ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশ বিদায়ী বছরে কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো শতাব্দীর দুটি বড় বিপর্যয় মোকাবিলা করেছে। এই সময়ে কিছু অর্থনৈতিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

এছাড়া পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু টানেল ও মেট্রোরেলের মতো চমকপ্রদ মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকার শত শত সেতু ও রাস্তার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এই অর্জনগুলো তুলে ধরতে আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ও পোস্টার শেয়ার করেছেন। 

অন্যদিকে, উন্নয়নকে খাটো করতে বিএনপি সমর্থকরা প্রকল্পে দুর্নীতি ও আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন। বিরোধীদের অনলাইন প্রচারণাকে একপাশে সরিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের অর্জন এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার প্রচার করছে।

যেখানে তারা ২০০১-০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত সরকারের অপকর্ম এবং ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যার পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলের কথা স্মরণ করছেন।

অনলাইনে উপস্থিতি বাড়াতে আওয়ামী লীগ সারাদেশে কমিটি গঠন করেছে ও প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সরকারের সাফল্য তুলে ধরছে।

ভার্চুয়াল ও রাজপথের আন্দোলন

গত বছরের শুরুর দিকে দলকে শক্তিশালী করতে বিএনপির শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা ঢাকায় ও পরে বিভাগীয় সদর দপ্তরে মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দেয়। এছাড়া এসব সভা-সমাবেশের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।

বিরোধীদলের নেতাকর্মীরা, মূলত বিএনপি, তার মিত্র ও সমমনা দলগুলো বেশ কয়েক বছর পর রাজপথে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু এই আন্দোলনে তারা নানাভাবে অনেক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ বিল এবং জ্বালানি তেলের বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলনগুলো সীমিত আকারে শুরু হলেও মূলধারার গণমাধ্যম ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। বিএনপি তার বিভাগীয় সমাবেশ শেষ করে। এরপরে ঢাকায় সমাবেশের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করলে এই প্রচারণা গতি পায়।

অক্টোবর থেকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা ১০ ডিসেম্বরে জনসভায় সরকার পতনের যে কথিত ডাক দিয়েছিলেন তা কোনো লক্ষণ ছাড়াই শেষ হয়।

এছাড়া দেখা যাচ্ছে, অক্টোবর-ডিসেম্বর থেকে বিরোধীদের আন্দোলন যে গতি পেয়েছিল ১০ ডিসেম্বরের পর সেটি অনেকাংশেই কমে এসেছে।

বিএনপি ঘোষণা করেছিল দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিলে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে না আনলে তারা নির্বাচন বয়কট করবে। তবে সরকার পদত্যাগ না করে ২০২৪ সালের যথাসময়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধীদলের আন্দোলনের খবর তাদের কর্মী ও সরকার সমালোচকদের কাছে ব্যাপক রসদ সরবরাহ করতে পেরেছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সতর্কতা

পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংবাদমাধ্যমে সরকারবিরোধী প্রচারণা চলেছে মহাসমারোহে।

দেশের সংবিধান অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষক ও সাংবাদিকরা।

তবে সমালোচনার মুখে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ও গ্রেপ্তারের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগের বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে একই ধরনের আইনি কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আইনের সংশোধনী আনার বিষয়েও জনগণকে আশ্বাস দেন আইনমন্ত্রী।

তা সত্ত্বেও সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারবিরোধী প্রচারণা বাড়তে পারে।