‘শরিকদের জয়ের নিশ্চয়তা দেবে না আওয়ামী লীগ’

বিএনপির বর্জনের ভোটে ২৯টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এরমধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রয়েছে ১৪ দলীয় জোট। জোট শরিকদের জন্য সাতটি আসন ছেড়ে দিয়েছে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা দলটি।

আসন সমঝোতা হলেও নির্বাচনে বিজয়ের “নিশ্চয়তা” দেবে না আওয়ামী লীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই বিজয়ী হতে হবে। আর সাতটির বেশি আসন ছেড়ে দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।”

শুক্রবার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ময়দানে থাকবে না বিএনপি। বিএনপির না থাকা ভোটের যুদ্ধে নির্বাচনী হাওয়া বইয়ে দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের “স্বতন্ত্র” প্রার্থীরা। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে টানতে “স্বতন্ত্র” প্রার্থীদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, স্বতন্ত্রদের মাঠে শক্ত অবস্থান থাকায় ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।

প্রায় প্রত্যেকটি আসনেই রয়েছে শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী। ফলে জোটসঙ্গীরা “ভোটে বিজয়ের প্রতিশ্রুতিতে” স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের কাছে সিদ্ধান্ত চাচ্ছিল বলে আলোচনা রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ এই নেতা এমন মন্তব্য করলেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, “দেশে ভালো নির্বাচনের রেকর্ড হবে, কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকবে না। কিন্তু বিএনপি এই নির্বাচন বানচালে অস্ত্র যোগাড় করছে।”

জোট রাজনীতির ইতিহাস

পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালে “যুক্তফ্রন্ট” গঠনের মধ্য দিয়ে বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে জোটবদ্ধ নির্বাচনী রাজনীতির শুরু হয়েছিল। তখনকার আওয়ামী লীগের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও কৃষক প্রজা পার্টির এ কে ফজলুল হক এই জোট গঠন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টের পর নানা ঘটনার ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। একপর্যায়ে তিনি রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হন। এরপর দেশে রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ উঠে গেলে সক্রিয় হয় আওয়ামী লীগ। দলটি সিপিবিসহ আরও কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে গঠন করে “গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট”। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে এই জোটের প্রার্থী ছিলেন জেনারেল এম এ জি ওসমানি।

জেনারেল এরশাদের নয় বছরের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোট আর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোটগুলোর মধ্যে নানা অসন্তোষ তৈরি হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। তবে নির্বাচনে অংশ নেয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোট। আবার আন্দোলনের দানা বেধে ওঠার পর ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বয়কট করে সব জোট। তখন আবার আসম আব্দুর রবের নেতৃত্বে আরেকটি জোট গঠিত হয় এবং তারাই সংসদে বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নেন।

জোটবদ্ধ হয়ে ১৯৯১ সালেও নির্বাচন হয়েছিল। সে সময় আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের পাঁচদলীয় জোট এবং বিএনপি ও কয়েকটি ছোট দল মিলিয়ে ৭ দলীয় জোট পরস্পরকে মোকাবিলা করে।

এরপর ১৯৯৬ সালে হয় দুটি নির্বাচন। ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি এবং বিএনপি সরকার পদত্যাগ করলে ওই বছরের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আরও একটি নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে সবগুলো দলই এককভাবে লড়াই করে।

জোটবদ্ধ নির্বাচনের প্রভাব বেশি দেখা গেছে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন থেকে। সে সময় আওয়ামী লীগের মোকাবিলায় বিএনপির চার দলীয় জোট ব্যাপক সফল হয়। জামায়াতে ইসলামী, কওমিপন্থীদের ইসলামী ঐক্যজোট এবং বিজেপি নামে জাতীয় পার্টির একাংশের শক্তি জয় পায় বড় ব্যবধানে।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে বামপন্থিদের একাংশ নিয়ে ১৪ দল এবং জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মহাজোট করে আওয়ামী লীগও। এর ফলও পায় তারা। সরকার গঠন করে মহাজোট।

২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি। আর ১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তার ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে নতুন জোট করে ভোটে আসে। আওয়ামী লীগও ফেরে মহাজোটে। এই নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। আর সংসদে বিরোধী দল হয় জাতীয় পার্টি।