নেতাকর্মীদের ‘অবাধ্য’ আচরণে চিন্তিত বিএনপি

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ৫ আগস্ট থেকে নেতাকর্মীদের “অবাধ্য” আচরণে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিএনপিসহ সহযোগী সংগঠন যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের অনেক নেতার অবাধ্য আচরণ, চাঁদাবাজি, বিরোধীদের হুমকি, হত্যা এবং স্বেচ্ছাচারী কার্যকলাপ নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব চিন্তিত। এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে তৎপর বিএনপি এখন দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জে। গত দুই মাসে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে দলের কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি। সম্প্রতি হাতিরঝিল এলাকায় বেসরকারি এক টেলিভিশন চ্যানেলের কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম রবির নাম আসায় প্রথমে তাকে শোকজ, পরে তার পদ স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়াও বিতর্কিত ব্যবসায়ীক গ্রুপ এস আলমের গাড়ি ব্যবহার করায় শোকজ করা হয়েছিল দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন, দলের নাম ভাঙিয়ে যারা অপরাধ করছে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, “অনুগ্রহ করে কেউ প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসাপরায়ণ হবেন না। কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নেবেন না। অর্জিত বিজয় যাতে লক্ষচ্যুত না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক এবং সজাগ দৃষ্টি রাখার রাখুন।”

তবে তারেক রহমানের নির্দেশনার পরেও তৃণমূলকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি। ইতোমধ্যে হার্ডলাইনে গেছে দলটি। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ বেশ কিছু ইউনিটের কমিটিও স্থগিত করা হয়েছে।

বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্দেশনা দেওয়া হলেও কিছু নেতাকর্মী তা উপেক্ষা করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে লিপ্ত রয়েছেন। এই ধরনের কাজের ফলে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে এবং জনগণের কাছে দলের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মনে করেছেন সিনিয়র নেতারা।

সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ১,০২৩ জন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫২৩ জনকে কারণ দর্শানোর নেটিশ, ৪৩৭ জনকে বহিষ্কার, ২৫ জনের পদ স্থগিত, ৩৫ জনকে সতর্ক এবং ৪ জনকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন স্তরের নেতা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার ও এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ও বিলকিস জাহান, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম। গত সপ্তাহের বুধবার সিলেটের পাথর কোয়ারি থেকে বালু ও পাথর লুটপাটের অভিযোগে জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলামের (শাহ পরান) দলীয় পদ স্থগিত করেছে দলটি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইতোমধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তৎপর হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কোনো ঘটনা সহ্য করা হবে না। যারা দলের আদর্শের বিপরীতে গিয়ে অপকর্ম করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিএনপি যে ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা রক্ষা করা দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ আশা করেছিল বিএনপির নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মতো চাঁদাবাজি দখলবাজি থেকে মুক্ত থাকবেন। কিন্তু কিছু নেতাকর্মীর অপকর্মের কারণে জনগণের মধ্যে বিএনপি নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান সময়টা বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ বিহীন ফাঁকা মাঠে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা যদি দ্রুত নেতাকর্মীদের মাঝে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেতে ব্যর্থ হয় তবে আগামী নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নির্বাচন পর্যন্ত দলীয় ঐক্য এবং জনসমর্থন ধরে রাখার জন্য বিএনপিকে তাদের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, “দলীয় নীতি ও শৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে সঙ্গে-সঙ্গে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও-কোথাও মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। আগামীতেও এটি অব্যাহত থাকবে।”