বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বেগম জিয়ার মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) নবায়ন করে তার কাছে হস্তান্তর করেছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। ইতোমধ্যে তার বিদেশ গমনের বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
দলটির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার চিকিৎসক বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে বিদেশে নেওয়া হচ্ছে। লন্ডনেই তার পরবর্তী চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরু হবে। তার চিকিৎসার জন্য পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে লন্ডনে কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগ করা হয়েছে।
জানা গেছে, বিমানে সফর করার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার কোনো শারীরিক সমস্যা হয় কি-না, সেটিকে প্রধান বিবেচনায় রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি চালাচ্ছেন চিকিৎসকরা। দলের নেতারা বিভিন্ন দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে তৎপরতা চালাচ্ছেন। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বা উন্নত বিমানে চিকিৎসা সরঞ্জাম-সংবলিত কেবিনে খালেদা জিয়ার ভ্রমণের বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ফ্লাইট সংক্রান্ত তৎপরতা শেষ হয়ে এলেই ভ্রমণের প্রস্তুতি নেবেন বেগম জিয়া।
বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “তার শারীরিক অবস্থা এখন কিছুটা ভালো। আমরা তাকে যুক্তরাজ্যে নেওয়ার কথা ভাবছি। যুক্তরাজ্যের কয়েকটি হাসপাতালের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তাই কিছুটা সময় লাগছে।”
সর্বশেষ গত ১২ সেপ্টেম্বর বেগম খালেদা জিয়া শারিরীকভাবে অসুস্থ রোধ করলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর এক সপ্তাহ চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি গুলশানের বাসভবন “ফিরোজা”য় ফিরেন। গত ১৪ অক্টোবর সকালে বিএনপির প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বার্তায় জানানো হয় তাকে বিকেলে হাসপাতালে নেওয়া হবে। তবে দুপুরের দিকে আরেক বার্তায় তার হাসপাতালে যাওয়ার বিষয়টি স্থগিত করা হয়েছে বলে জানানো হয়। এর আগে গত ৭ জুলাই শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় বাসভবনে ফিরে আসেন।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে দুদকের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দির পর খালেদা জিয়ার শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দেয়। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত করে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয়। এরপর ছয় মাস পরপর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার সাজা স্থগিত করে মুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছিল সরকার। ৭৮ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, লিভার সিরোসিস-সহ নানা রোগে ভুগছেন। ইতোমধ্যে তিনি কয়েক দফা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দফায় দফায় খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেওয়ার জন্য চিঠি ও আহ্বান জানালেও তা মানেনি সাবেক সরকার। পরিবার থেকে সরকারের কাছে কয়েক দফা আবেদন করা হলেও অনুমতি মেলেনি। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিন জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এনে ঢাকায় এভারকেয়ার হাসপাতালে বিএনপি নেত্রীর রক্তনালিতে অস্ত্রোপচার করেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেওয়া হয়।
খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ডা. আল-মামুন বলেন, “তার জন্য দেশের বাইরে থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স আনা হবে। তিনি আরেকটু ফিট হলেই দিন, তারিখ ঠিক করা হবে। খালেদা জিয়ার লিভার সিরোসিস ছাড়াও বেশ কয়েকটি জটিলতা রয়েছে। তার পুরো শরীর চেকআপ করে অন্য জটিলতাগুলো কমিয়ে আনতে হবে। প্রথমেই লিভার প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তাই শারীরিক অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস উইং-এর সদস্য শামসুদ্দিন দিদার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা এখন ভালো আছে। তাকে খুব দ্রুত বিদেশে নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সব প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশবাসীর কাছে তিনি দোয়া চেয়েছেন।”