ড. অলি আহমদ, বীর বিক্রম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ এবং সাবেক মন্ত্রী। বর্তমানে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান। তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি সেনা কর্মকর্তা যিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। ৭৫ পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হলেন তখন তিনি তার ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করে বিএনপিতে যোগ দেন।
সম্প্রতি তার সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের আগের ও পরের ঘটনাবলি নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা ট্রিবিউনের তানভীর হাসান।
ঢাকা ট্রিবিউন: ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিল্পবের পিছনে কী কারণ ছিল বলে আপনি মনে করেন?
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে আর্মি সর্বপ্রথম পাকিস্থানি সেনাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। ওইদিন রাত্রে তিনি সবাইকে একত্রিত করে বললেন “we revoeld”, অতঃপর আমরা সবাই মুক্তি সংগ্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অন্যদিকে, শেখ মুজিব পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। যুদ্ধ চলাকলে তিনি তো বাংলাদেশে আসেননি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তো সংগ্রাম করলো দেশের সাধারণ জনতা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি লন্ডন হয়ে দিল্লি গেলেন। এরপর দিল্লি থেকে দেশে ফিরলেন। দেশে ফিরে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ভরসা না রেখে গড়ে তুললেন রক্ষীবাহিনী। জনগণকে দমনে গঠন করেন মুজিব বাহিনী। ফলে ক্রমেই সেনাবাহিনীতে তার প্রতি ক্ষোভ তৈরি হতে থাকে। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় গণহত্যার বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সুশাসনের পক্ষে ন্যায় বিচারের পক্ষে কথা বলেছেন। কিন্তু তিন স্ববিরোধী কাজ করতে শুরু করলেন। এই প্রেক্ষাপটে ১৫ আগস্ট একদল সেনা অফিসার তাকে হত্যা করে। তার এই মৃত্যুর পিছনে অন্যতম কারণ ছিল, তিনি ওয়াদা থেকে সরে গিয়েছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন একদলীয় বাকশাল শাসন। ফলে যা হবার তাই হলো, তিনি নিহত হলেন। তাকে যারা হত্যা করলেন সেই সেনা অফিসাররা তার বন্ধু খন্দকার মোশতাককে নতুন রাষ্ট্রপতি করলেন। ওই অফিসারদের বিরুদ্ধে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ক্যু করলেন। নিজেকে মেজর জেনারেল ঘোষণা করে নিজেই সেনাপ্রধান হয়ে গেলেন। গৃহবন্দি করা হলো তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। কিন্তু খালেদের এই অভ্যুত্থান সাধারণ সেনা সদস্যরা মেনে নেননি। ফলে আরেকটি পল্টা ক্যু সংগঠিত হলো। এই ক্যু’তে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা জিয়াউর রহমানকে পুনরায় তার সম্মান ফিরিয়ে দিয়ে তাকে সেনা প্রধান হওয়ার প্রস্তাব দিল। ওই পরিস্থিতিতে তিনি আবারো সেনা প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
৩ নভেম্বরের ক্যু কী আসলেই সেনাবাহিনীতে চেইন অফ কমান্ড ফেরানোর জন্য হয়েছিল? আর একটি অভ্যুত্থান সংগঠিত হওয়ার মাত্র দিন দিনের মধ্যে আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থান কীভাবে হলো?
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানটা হয়েছিল আওয়ামী লীগের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য। তৎকালীন ব্রিগেডের জেনারেল খালেদ মোশারফ আওয়ামী লীগের স্বার্থে ও বিদেশী শক্তির সহায়তায় ৩ নভেম্বর ক্যু করেছিলেন। আর্মিতে তখন শৃঙ্খলা খুবই ভালো ছিল। জিয়াউর রহমান অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দক্ষ সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। যার জন্য তিনি শেখ মুজিবের সময় উপ-সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। মূলত তারই সেনাবাহিনী প্রধান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সিনিয়রিটি ব্রেক করে শফিউল্লাহ সাহেবকে সেনাপ্রধান বানালেন। ১৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীতে সবকিছুই ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু খালেদ মোশারফ আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার জন্য ৩ তারিখ ক্যু করেছিলেন। ক্যুর পরে খালেদের মা ও তার ভাই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আওয়ামী লীগের পক্ষে মিছিলও করেছিল। খালেদ মোশাররফ দায়িত্ব নেওয়ার পরে ওই তিনদিন আর্মিতে কোনো শান্তিশৃঙ্খলা ছিল না। বিশৃঙ্খল অবস্থার জন্য তাকে মৃত্যৃবরণ করতে হয়েছে। বরং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতা আরেকটি অভ্যুত্থান সংগঠিত করেছিল।
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের কেন বিদেশে পাঠানো হলো?
৩ নভেম্বরের ক্যু-এর পর শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের দাবি ছিল, তাদের যেন চাকরি দিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়। যারা বিদ্রোহী ছিল তারাও চাচ্ছিল যেন শেখ মুজিবের হত্যাকারীরা বিদেশে চলে যায়। তখন জিয়াউর রহমান সাহেব চিন্তা করলেন, কয়েকজন লোক চাকরি নিয়ে বিদেশে যাওয়ায় যদি দেশে শান্তি ফিরে আসে তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই। তখন দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য, সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরে আনার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিল না।
সৈনিকদের মাঝে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার কারণ কী ছিল?
জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম অফিসিয়ালি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। জাতির দুর্দিনে তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যখন আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো, বাংলাদেশের জনগণের ওপর আক্রমণ করলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আক্রমণ করলো, বহু লোক নিহত হলো। সমগ্র জাতি একটি হতাশাজনক অবস্থায় ছিল। ওই সময় তৎকালীন মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে সমগ্র জাতি আবার একত্রিত হলো। তারা একটি দিক নির্দেশনা পেল। ফলে বাঙালি সেনাদের সঙ্গে যোগ দিল সাধারণ জনগণ। তিনি ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। ফলে সেনাবাহিনীসহ সারাদেশের মানুষের কাছে তার একটা জনপ্রিয়তা ছিল।
৭ নভেম্বরের বিল্পবে জাসদের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
জাসদের গণবাহিনীর ঢাকার দায়িত্বে ছিলেন হাসানুল হক ইনু, আর পুরো বাংলাদেশের দায়িত্বে ছিলেন কর্নেল আবু তাহের। আবু তাহের যখন সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন ওই সময় তিনি গণবাহিনীর হাজার হাজার সদস্যদেরকে আর্টিলারি আর্মাট, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিকেল কোরে ভর্তি করেছিলেন। মূলত তিনি চেয়েছিলেন তাদের মাধ্যমে একটি ক্যু করে জিয়াউর রহমানকে সামনে রেখে ক্ষমতা দখল করা। যা সিপাই-জনতা মেনে নিতে পারেনি। সিপাহী-জনতা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ওপরে ভরসা রেখেছিল।
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান কী জিয়াউর রহমানকে রাজনীতি সরাসরি জড়িত হওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছিল?
জিয়াউর রহমান রাজনীতি করতে চাননি। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাঁচ ব্রিগেড থেকে পাঁচ ডিভিশনে উন্নিত হয়। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীকে নতুনভাবে সাঁজিয়েছিলেন তিনি। দেশের কৃষি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব, খাল খনন এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা ফিরে আনার জন্য তার একটি বিরাট ভূমিকা ছিল। তিনি ধীরে-ধীরে রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। ওই জায়গা থেকে সামরিক বাহিনীতে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না। একমাত্র পথ ছিল সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, পিছনের দিকে ফিরে আসা নয়।
খালেদ মোশাররফসহ অন্যান্য সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল বলে মনে করেন?
মেজর জেনারেল খালেক মোশাররফ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দার এবং কর্নেল হুদা যখন বঙ্গভবন থেকে পালিয়ে যায় তখন সমগ্র ঢাকা উল্লাস করছিল। তারা ভয়ে সাভারের দিকে পালিয়ে যায়। তারা ১০ বেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় নেয়। তারা ভেবেছিল সেখানে হয়তো তারা নিরাপদ থাকবেন। কারণ, এই ১০ বেঙ্গল বেজিমেন্ট ছিল খালেদ মোশাররফের অধীনে। জিয়াউর রহমান জানতে পারেন তারা সাভারে অবস্থান করছেন। তখন তিনি সাভারে টেলিফোন করে বলেছিলেন আমার অফিসারদের যে কোনো ক্ষতি না হয়। কারো ওপরে যেন অত্যাচার নিপীড়ন বা হত্যা করা না হয়। তাদেরকে নিরাপদে আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করো। কিন্তু ওইখানে যেসব সেনারা ছিল তারা জিয়াউর রহমানের কথা না শুনে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের কোন সংশ্লিষ্টতা ছিল না, কারণ জিয়াউর রহমান তখন ছিল ঢাকায় আর তারা ছিল সাভারে।
২০১৪ এর জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে ৭ নভেম্বরের বিল্পবের কোনো মিল রয়েছে বলে মনে করেন কী?
৭ নভেম্বরের বিপ্লব আর আগস্ট মাসের বিপ্লব এক নয়। যেখানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সঙ্গে জনতা এক হয়ে বিদ্রোহ করেছিল। এই বিল্পবেও সমগ্র জাতি একসাথে হয়েছে। তবে এখানে সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের সম্পৃক্ততা তেমনভাবে ছিল না। সুতরাং দুইটার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। তারপরেও আমি বলব, এটাও একটা ঐতিহাসিক বিল্পব। ৭৫ এ বিপ্লব হয়েছিল শেখ মুজিব এর বিরুদ্ধে আর এখন হলো তার কন্যার বিরুদ্ধে। সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। এটা তো একদিনে শুরু হয়নি। এই বিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৫ বছর আগে। আমরা ধাপে ধাপে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। শেষপর্যায়ে এসে ছাত্র-জনতা বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছে।