অর্থনীতিবিদদের টেবিলজুড়ে সব সময় যুদ্ধবিগ্রহের আঁচ, মূল্যস্ফীতির খতিয়ান কিংবা সামষ্টিক অর্থনীতির একঘেয়ে মারপ্যাঁচ থাকলেও, চার বছর পরপর তারাও মেতে ওঠেন বিশ্বকাপের ফুটবল উন্মাদনায়। আগামী বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স বিশ্বের নামীদামি ১৬০ জন অর্থনীতিবিদের ওপর একটি বিশেষ জরিপ চালিয়েছিল। জটিল সব অর্থনৈতিক তত্ত্ব দেওয়া এই পণ্ডিতেরা অকপটে স্বীকার করেছেন, মূল্যস্ফীতির কঠিন হিসাব কষা যত না জটিল, তার চেয়েও ঢের কঠিন বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম বলা।
তবে সব হিসাব-নিকাশ শেষে এই বিশ্লেষকদের গাণিতিক মডেল আর মনের সহজাত অনুভূতি এবার এক সুরে কথা বলছে ফরাসিদের পক্ষে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে ফ্রান্স।
অর্থনীতিবিদদের এই ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি হয়, তবে ফরাসি কোচ দিদিয়েরা দেশম ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব পেয়ে যাবেন। ইতালির ভিত্তোরিও পোজ্জোর পর দ্বিতীয় কোচ হিসেবে তিনি গড়বেন দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি। একই সঙ্গে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার পর আবারও কোচ হিসেবে ট্রফি ছোঁয়ার অনন্য এক রেকর্ডও হয়ে যাবে তার।
জরিপে ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ফরাসিরা যেখানে শীর্ষ ফেভারিট, ৩১ শতাংশ ভোট নিয়ে স্প্যানিশরা ঠিক তাদের ঘাড়েই নিশ্বাস ফেলছে। শীর্ষ পাঁচের বাকি তিনটি নামও বেশ চেনা, বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল ও ইংল্যান্ড।
সেলেসাও সমর্থকেরা এই জরিপ দেখে নির্ঘাত চোখ ফিরিয়ে নেবেন। কার্লো আনচেলত্তির মতো হাইপ্রোফাইল ‘চাণক্য’ ডাগআউটে থাকার পরও পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না বিশ্লেষকেরা। ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে বিদায়ের ক্ষত এখনো দগদগে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থনীতিবিদের চোখে এবার ব্রাজিলের কপালে জুটছে ‘সবচেয়ে বড় হতাশাজনক পরাশক্তি’র তকমা। ব্রাজিলের পেছনেই এই তালিকায় আছে ইংল্যান্ড ও জার্মানি।
লন্ডনভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘আরবিসি’র জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ক্যাথাল কেনেডি ফরাসিদের এই রাজত্ব ফিরে পাওয়ার পেছনে নিরেট যুক্তি দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, ২০২২ ফাইনালের সেই লুসাইল ট্র্যাজেডির ক্ষত ভুলে ফ্রান্স এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। দলটিতে একঝাঁক অভিজ্ঞ ফুটবলারের পাশাপাশি পিএসজি থেকে উঠে আসা কিছু দুর্দান্ত তরুণ রয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড হিসেবে তারা পাচ্ছে একদম ফুরফুরে মেজাজে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে।
কিলিয়ান এমবাপ্পেই এবার ‘গোল্ডেন বল’ আর ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে। বিশ্লেষকদের চোখে তাঁর ঠিক পেছনেই আছেন হ্যারি কেইন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে এই মৌসুমে ক্যারিয়ার-সর্বোচ্চ ৬১ গোল করে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জেতা কেইন এবার ইংলিশদের প্রধান স্বপ্নসারথি।
এই দুই মহাতারকার সামনেই রয়েছে নতুন ইতিহাস গড়ার হাতছানি। বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোল ১২টি এবং কেইনের ৮টি। জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ড ভাঙার দৌড়ে লিওনেল মেসির (১৩ গোল) সঙ্গে লড়বেন তাঁরাও।
অর্থনীতিবিদদের এই অনুমানের পেছনে কি শুধুই খাতা-কলমের হিসাব? জরিপে অংশ নেওয়া ৭৩ শতাংশ অর্থনীতিবিদ জানিয়েছেন, কোনো যুক্তি নয়, তারা মনের সহজাত অনুভূতি থেকেই এই অনুমান করেছেন। তবে ৮ শতাংশ অর্থনীতিবিদ অকপটে স্বীকার করেছেন, দেশের প্রতি অন্ধ ভালোবাসাই তাদের দিয়ে দল পছন্দ করিয়েছে (যেমন দুজনের চোখে চ্যাম্পিয়ন জাপান, একজনের চোখে মেক্সিকো আর একজনের ভোট পড়েছে মরক্কোর বাক্সে)। বাকি প্রায় ২০ শতাংশ অর্থনীতিবিদ অবশ্য খাঁটি পেশাদারের মতো কঠিন সব ডেটা ও বিশেষ গাণিতিক মডেলের ওপর নির্ভর করেছেন।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে ৪৮টি দলের, যেখানে ম্যাচ হবে মোট ১০৪টি। যৌথ আয়োজক হিসেবে থাকছে তিন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। এত বড় মহাযজ্ঞে ‘আন্ডারডগ’ বা কালো ঘোড়া হিসেবে ২১ শতাংশ ভোট নিয়ে সবার আগে আছে আর্লিং হলান্ডের নরওয়ে। ১৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তাদের পেছনেই আছে জাপান।
উদীয়মান তারকার ক্যাটাগরিতে স্পেনের ১৮ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। আর গোলপোস্টের নিচে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ জয়ের লড়াইয়ে ফেবারিটের তালিকায় আছেন ফ্রান্সের মাইক মাইনিয়, আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও স্পেনের উনাই সিমন।