২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির জাদুকরী গোল আলজেরিয়ার জাল স্পর্শ করতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে ঢাকার রাজপথ। গায়ে আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল জার্সি জড়ানো এই সমর্থকদের কেউই কিন্তু আর্জেন্টিনার নাগরিক নন; তারা সবাই বাংলাদেশি। শুধু ঢাকা নয়, ভারত থেকে জাকার্তা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের ফুটবলের প্রতি আবেগ এভাবেই আবর্তিত হয় অন্য দেশের জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে।
বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উন্মাদনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এই অঞ্চলের দেশগুলো নিজেরা কেন কখনোই বিশ্ব ফুটবলের মহোৎসবে জায়গা করে নিতে পারছে না, তার একটি গভীর বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয়েছে।
আসলেই কি আকার বা জনসংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ?
তাত্ত্বিকভাবে বলা হয়, জনসংখ্যা যত বেশি, প্রতিভাবান খেলোয়াড় খোঁজার সুযোগ তত উন্নত। কিন্তু ২০২৬ সালের আসরের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষ ১০টি জনবহুল দেশের মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। চীন বা ইন্দোনেশিয়া মাত্র একবার করে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। অন্য দুটি দেশ - রাশিয়া ও নাইজেরিয়া আগের বেশ কয়েকটি আসরে অংশ নিয়েছিল। আর ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এখনো কেবল স্বপ্নই দেখে চলেছে।
যদিও ভারত ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে নিয়ম অনুযায়ী খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল, তবে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার এক মাসেরও কম সময় আগে তারা নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়।
ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও ‘সকারনমিকস’ গ্রন্থের সহলেখক স্টেফান শিমানস্কির মতে, ফুটবলে সফল হতে জনসংখ্যা কেবল একটি প্রাথমিক উপাদান মাত্র। এর সাথে প্রয়োজন তিনটি মূল স্তম্ভ:
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মূলধন: ফুটবলীয় অবকাঠামো এবং উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধার জন্য অর্থের যোগান অপরিহার্য। সাধারণত কোনো বড় শিরোপা জিততে দেশের মাথাপিছু বার্ষিক আয় কমপক্ষে ১৫,০০০ ডলার হওয়া প্রয়োজন।
অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান: ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মাথাপিছু আয় কম হলেও তারা সফল, কারণ তাদের রয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা।
প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ: ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ খেলে নিজেদের ঝালিয়ে নিয়েছে, যা এশিয়া বা আফ্রিকার অনেক দেশ পায়নি। উদাহরণস্বরূপ, মাত্র ৩৫ লক্ষ মানুষের দেশ উরুগুয়ে ১৯০২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলছে এবং দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে।
আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, যেগুলোর রাষ্ট্র হিসেবে ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন অথবা যেখানে ফুটবলের বিকাশ পরে শুরু হয়েছে, তাদেরও অন্যদের সমকক্ষ হতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।
তবে কয়েকটি দেশ ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখিয়েছে। যেমন - ১৯৫৬ সালে স্পেন ও ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়া মরক্কো ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠা ইতিহাসের একমাত্র আফ্রিকান দেশ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, ২০০২ সালে যৌথ আয়োজক হিসেবে অংশ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে শেষ চার দলে পৌঁছানো ইতিহাসের একমাত্র এশীয় দেশ হয়।
তবে শিমানস্কি বলেন, “এরপর আমরা ইন্দোনেশিয়া, ভারত, বাংলাদেশসহ আরও কিছু দেশকে দেখি, যারা এখনো সেই ব্যবধান কমিয়ে আনতে পারছে না। মূলত পর্যাপ্ত সম্পদ ও সক্ষমতার অভাবের কারণেই এসব দেশ পিছিয়ে রয়েছে।”
বিভিন্ন দেশের চিত্র: সংকট ও সীমাবদ্ধতা
ইথিওপিয়ার পরিকাঠামো সংকট: ২০১৪ সালে ইথিওপিয়া বিশ্বকাপের কাছাকাছি গেলেও বর্তমানে তারা তীব্র মাঠ সংকটে ভুগছে। বর্তমানে ইথিওপিয়ার ফুটবল এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যাকে দেশটির স্থানীয় সংবাদমাধ্যম খেলাটিতে চরম বিনিয়োগ-সংকট বলে বর্ণনা করছে। এর একটি উদাহরণ হলো, দেশটির চলমান পেশাদার লিগে ম্যাচ আয়োজনের জন্য উপযুক্ত মাঠের সংকট দেখা দেওয়ায় পুরো মৌসুমই সমস্যার মধ্যে পড়েছে।
ইথিওপিয়ার পেশাদার লিগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিফলে সাইফে ২৭ জুন দ্য রিপোর্টার পত্রিকাকে বলেন, “এই মৌসুমে আমরা মাত্র তিনটি অনুমোদিত মাঠ ব্যবহার করে ৩৮০টিরও বেশি ম্যাচ আয়োজন করেছি।”
ভারত ও বাংলাদেশ: ভারতের সাবেক ফুটবলার শ্যাম থাপার মতে, আইপিএলের আকাশচুম্বী আর্থিক সাফল্যের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানদের ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেটের দিকে বেশি ঠেলে দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের অদিতে করিম এই যুক্তি মানতে নারাজ। তার মতে, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে পরাশক্তি হয়েও ফুটবলে উন্নতি করছে। আসল সমস্যা হলো দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব।
চীন: অলিম্পিকে সফল হলেও ফুটবলে চীন ব্যর্থ। ফুটবল বিশেষজ্ঞ মার্ক ড্রায়ারের মতে, ফুটবলের সিদ্ধান্তগুলো অভিজ্ঞদের হাতে না রেখে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেই কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের পরও চীন ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি।
ইন্দোনেশিয়া: ১৯৩৮ সালে নেদারল্যান্ডসের উপনিবেশ ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ’ নামে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বকাপে খেলেছিল। তবে ২০২৬ সালের বাছাইপর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দলটি বেশ ভালো খেলেছে এবং শেষ বাছাইপর্ব পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তবে সেই সাফল্যের পেছনে নিজেদের দেশে গড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের চেয়ে ইউরোপে বেড়ে ওঠা ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দলে নেওয়ার সিদ্ধান্তই বেশি ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়।
বিবিসির ইন্দোনেশিয়া বিভাগের সংবাদ সম্পাদক জেরোম উইরাওয়ান বলেন, “কখনো কখনো ইন্দোনেশিয়ার প্রথম একাদশে আট বা নয়জন ইউরোপে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড় ছিল।”
এছাড়া, ফুটবল পরিচালনাকারী সংস্থার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা পাকিস্তানকে তিনবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করেছিল। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এশিয়া অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে। ছয়টি ম্যাচ খেলেও দুটি দলই একটি ম্যাচেও জয় পায়নি।
ফুটবল উৎসবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে চান না এই দেশের মানুষ। অদিতে করিমের ভাষায়: “বর্তমান বাস্তবতায় আমার জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে দেখা হয়তো সম্ভব নয়। তবুও ফুটবলের এই বৈশ্বিক মহোৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত আমরা উপভোগ করব।”
নিজের দেশের অনুপস্থিতিতেও ফুটবলের প্রতি এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।