ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ঈদুল আজহা উপলক্ষে পৌর এলাকার ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ভিজিএফের ৬৩০ কেজি চাল জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মী ও সাবেক কাউন্সিলরের বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে প্রশাসন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন এবং ধর্মীয় মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (২০ মে) রাত সাড়ে ৮টার দিকে বোয়ালমারী পৌরসভার আঁধারকোঠা গ্রামের বাসিন্দা, জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ও পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সামাদ খানের বাড়ির নিচতলা থেকে এসব চাল উদ্ধার করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা গেছে, সরকারি চাল একটি ব্যক্তিগত বাড়িতে অবৈধভাবে মজুত রাখা হয়েছে, এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার রাতে ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। অভিযান পরিচালনা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ও বোয়ালমারী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিব্বির আহমেদ। এ সময় তার সঙ্গে বোয়ালমারী পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযানকালে সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সামাদ খানের বাড়ির নিচতলা থেকে ১২টি সরকারি বস্তায় ভরা এবং খুচরা ৩০ কেজিসহ সর্বমোট ৬৩০ কেজি চাল উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে উদ্ধারকৃত চালগুলো জব্দ তালিকাভুক্ত করে পৌরসভার হেফাজতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকারিভাবে বোয়ালমারী পৌর এলাকার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সহায়তার জন্য এই ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই চাল সরকারি খাদ্যগুদাম কিংবা পৌরসভার নির্ধারিত কোনো নিরাপদ স্থানে না রেখে সাবেক কাউন্সিলরের ব্যক্তিগত বাসভবনে সংরক্ষণ করা নিয়ে স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এই বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সাহা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি সহায়তার চাল দরিদ্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের খাদেমদের মাঝে নিয়ম অনুযায়ী বিতরণ করার কথা। অথচ সেই চাল একজন সাবেক কাউন্সিলরের ব্যক্তিগত বাড়িতে উদ্ধার হলো। আমরা এই বিষয়টির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছি এবং এর পেছনে জড়িত দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
তবে চাল আত্মসাৎ বা অবৈধ মজুতের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সামাদ খান বলেন, “প্রতি বছরই পৌর এলাকার ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সুবিধার্থে চালগুলো সংগ্রহ করে আমার বাড়িতে এনে রাখা হয়। এর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ বা সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও ফাঁসানোর জন্য একটি মহল এটিকে বড় করে দেখাচ্ছে।”
অন্যদিকে বোয়ালমারী ইমাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাহেব আলী সাবেক কাউন্সিলরের বক্তব্যকে সমর্থন করে জানান, বুধবার বিকেল ৩টার দিকে পৌরসভা থেকে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য বরাদ্দকৃত চালগুলো এনে সামাদ খানের বাড়িতে সাময়িকভাবে রাখা হয়েছিল। আগামী সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলো বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই রাতে প্রশাসন এসে চালগুলো নিয়ে যায়।
তবে ইমাম পরিষদের এই দাবির পরও স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন যে, সরকারি কোনো খাদ্যসামগ্রী এভাবে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বাসভবনে সংরক্ষণের আইনি বৈধতা রয়েছে কি না। তাদের দাবি, বিতরণের আগ পর্যন্ত সরকারি চাল সরকারি দপ্তরের সম্পূর্ণ নিজস্ব তত্ত্বাবধানেই থাকা উচিত ছিল।
অভিযান ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট শিব্বির আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে ১২টি বস্তায় মোট ৬৩০ কেজি সরকারি চাল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। উদ্ধারকৃত সব চাল ইতিমধ্যে পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সরকারি চাল যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে ব্যক্তিগত বাড়িতে রাখার অপরাধে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”



