Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রামিসা হত্যায় নতুন মোড়, কে এই ডলার

মামলার প্রধান আসামি সোহেলের বক্তব্য ঘিরে নতুন রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে

আপডেট : ০২ জুন ২০২৬, ০২:৫৮ পিএম

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানার বক্তব্য ঘিরে নতুন রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনার প্রধান আসামি সোহেল রানা এখন দাবি করছে, শিশু রামিসাকে ‘ধর্ষণ ও হত্যা করেছে ডলার’ নামের এক ব্যক্তি।

সোমবার (১ জুন) অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ওইদিন আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এজলাসে তোলা ও নামানোর সময় সোহেল রানা অনবরত ডলারের নামটি বলতে থাকে।

পুলিশ সোহেল রানাকে যখন আদালতের এজলাসে তুলছিল, তখন সে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বারবার বলতে থাকে, “ধর্ষণ করছে ডলার। তাকে ধরেন। ধর্ষণ করেছে ডলার, মারছেও ডলার। আমি শুধু লাশ গুম করতে চেয়েছি। কিন্তু পারিনি।” ওই সময় সোহেলের কাছে সাংবাদিকরা ডলারের পরিচয় জানতে চাইলে সে জানায়, “ডলারের বাসা মিরপুরের ১১ নম্বরে। সে ধনী মানুষ।”

শুনানি শেষে সোহেল রানাকে আদালতের হাজতখানায় নেওয়ার সময়ও সে বলতে থাকে, “ধর্ষণ ও হত্যা করেছে ডলার। মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার আমাকে ২ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল।” পরবর্তীতে তাকে প্রিজনভ্যানে কারাগারে নেওয়ার সময় আদালত অঙ্গনেই সে চিৎকার করে বলতে থাকে, “ডলার আমাকে নেশা করিয়েছে। ধর্ষণ করেছে ডলার, মারছেও ডলার। আপনারা ডলারকে ধরেন, ডলারকে খুঁজলে আপনারা সব খুঁজে পাবেন।” তবে এই পুরো সময়ে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কোনো কথা বলেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত এই ডলারের বাসা পল্লবী এলাকাতেই। সোহেলের যে ভাড়া বাসায় শিশু রামিসার ওপর পাশবিকতা চালানো হয়েছে এবং নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেই বাড়িটির তিন থেকে চারটি বাড়ির পরই ডলারের বাড়ি। এই ডলার মাদকাসক্ত এবং পেশায় একজন অটোরিকশা চালক।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডলার অটোরিকশা চালক হওয়ায় রিকশার গ্যারেজ মেকানিক আসামি সোহেলের সঙ্গে তার আগেই পরিচয় ছিল এবং গ্যারেজে তার যাতায়াত ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ডলার নিজে টাকার মালিক না হলেও তাদের পরিবার অবস্থাসম্পন্ন এবং তারা ওই এলাকার বাড়ির মালিক। ডলার মূলত নেশার টাকা জোগাতে অটোরিকশা চালায়। তারা পাঁচ ভাই ও দুই বোন, যার মধ্যে ডলার সবার ছোট।

ডলারের বড় ভাই সেলিম রায়হান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ভাই হিসেবে তিনি ডলারকে অস্বীকার করতে পারেন না। তবে গত ১৯ বছর ধরে পরিবারের কারও সঙ্গেই ডলারের সম্পর্ক নেই। বাড়ি ভাগাভাগির পর ভাইবোনেরা যে যার মতো বসবাস করছে। ডলার নেশা করার কারণে পরিবারের কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। তিনি আরও বলেন, “গণমাধ্যমে দেখেছি রামিসার খুনি সোহেল রানা ডলারের ওপর দায় চাপিয়েছে। এতবড় নৃশংসতায় ডলার ন্যূনতম সম্পৃক্ত থাকলে তারও ফাঁসি হোক, সেটা আমরাও চাই। কারণ এমন ঘটনায় যেই জড়িত হোক, সর্বোচ্চ বিচার হওয়া উচিত।”

রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক ওহিদুজ্জামান ভূঁইয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “তদন্তের সময়ই একই এলাকার ডলার নামে একজনের কথা জেনেছিলাম। তবে তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে ওই ব্যক্তির কোনো সম্পৃক্ততা মেলেনি। ডিজিটাল তদন্তেও ঘটনাস্থলে ওই ব্যক্তির উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এ জন্য চার্জশিটে তার নাম দেওয়া হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “তদন্তে দেখা গেছে, ধর্ষণ ও হত্যার পর আসামি জানালার গ্রিল কেটে একাই পালিয়েছিল। ঘটনাস্থলে ডলার নামে কেউ ছিল না। সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদেও তারা তখন এ নামে কিছু বলেনি। এখন কারাগারে গিয়ে হয়তো কারও শেখানো কথা বলে বিচার কার্যক্রমে ঝামেলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।” পুলিশ কর্মকর্তা ওহিদুজ্জামান জানান, প্রতিবেশী ডলারের সঙ্গে আসামি সোহেল রানার পূর্বশত্রুতা রয়েছে, যার কারণে সে তাকে জড়ানোর চেষ্টা করছে। এই মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও নজর রেখেছিল, তাই এখানে সম্পৃক্ত কাউকে বাদ দেওয়া বা নির্দোষ কাউকে জড়ানোর সুযোগ নেই।

ডলারের বিষয়ে জানতে চাইলে আসামিপক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ বলেন, “আমি আসামির সঙ্গে কথা বলেছি, আসামি আমাকে ডলার সম্পর্কে কিছু বলেনি। তারা শুধু নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছে।”

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “আসামি সোহেল রানা যে ডলারের নাম বলেছে, তদন্ত কর্মকর্তা তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ পাননি। এখন যদি আসামি মুখে বলে, তবে সেটা প্রমাণের বিষয়।” তিনি আরও বলেন, “আসামির রেকর্ডের বাইরে অন্য কিছু বলার অর্থ হলো নিজের অপরাধকে অন্যদিকে ডাইভার্ট (ঘুরিয়ে দেওয়া) করা। যারা প্রফেশনাল ক্রিমিনাল তাদের প্রবণতা হলো, তদন্ত কর্মকর্তাকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করে দেওয়া যেন তারা অন্যদিকে তদন্ত করে। এই আসামি এজলাসে কিছু বলেনি, তার মানে আসামি মিডিয়ার সামনে সবাইকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে।”

উল্লেখ্য, গত ১৯ মে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীতে তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা ঘটনার পর বাসার গ্রিল ভেঙে পালিয়ে গেলেও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে তখনই আটক করা হয়। আর ওইদিনই সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার পরদিন মামলা হলে বিকেলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সোহেল রানা এবং দ্রুত তদন্ত শেষে ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় গত ২৪ মে পুলিশ আদালতে চার্জশিট জমা দেয়।

   

About

Popular Links

x