Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সরিয়ে ফেলা হচ্ছে মাজারের দিঘির সেই কুমিরটিকে

মঙ্গলবার (২ জুন) এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ১১:২১ এএম

বাগেরহাটের হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে ছাড়ার ২২ বছর পর সেই কুমিরটিকে সুন্দরবনে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। দুটি প্রাণঘাতী ঘটনার পর মাজারে আগত দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী ও ভক্তদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

মঙ্গলবার (২ জুন) দিবাগত রাত ১০টায় জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন।

সভা শেষে তিনি বলেন, “মাজার এলাকায় আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপাতত দিঘিতে থাকা কুমিরটিকে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাজার এলাকায় পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।”

বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “৩ জুন মাজারের দিঘি থেকে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে খুলনা থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসবে বাগেরহাটে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কুমিরটি ধরার কৌশল, স্থানান্তরের সময় এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় নির্ধারণ করবেন।”

১ জুন রাত ৮টার দিকে মাজার সংলগ্ন দীঘিতে গোসল করতে নামা ৭ বছরের শিশু ফাতেমা আক্তার কুমিরের আক্রমণের শিকার হয়। কুমিরটি শিশুটিকে পানির নিচে টেনে নিয়ে যায়। পরে ২ জুন ভোরে মাজার সংলগ্ন দিঘির ‘মহিলা ঘাট’ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। 

এর আগে গত ৮ এপ্রিল একটি অসুস্থ কুকুরকে কুমির ধরে নিয়ে যায় ঘাট থেকে। পরদিন কুকুরটির মরদেহ উদ্ধার হয়।

এ ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা, দর্শনার্থী ও ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের জরুরি সভায় কুমিরটি সুন্দরবনে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী মাজার দিঘিতে অস্তিত্ব সংকটে মিঠাপানির কুমির। প্রায় ৬শ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় দিঘিতে বিচরণ করে আসছিল। কিন্তু সেগুলো বিলুপ্ত হওয়ার পর এ দিঘিতে মিঠাপানির কুমির না থাকায় দর্শনার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

প্রায় ২শ একর আয়তনের বিশাল এই দিঘিটি। এটি আধ্যাত্মিক সাধক, ধর্মপ্রচারক ও সমর নায়ক হযরত খানজাহান আলী (রহ.) খনন করার পর যাতে কেউ সুপেয় পানি নষ্ট করতে না পারে সেজন্য দিঘিতে এক জোড়া মিঠাপানির কুমির ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই থেকেই বংশ পরম্পর দিঘিতে এই কুমির বসবাস করে আসছে। বয়সজনিত কারণে শতবর্ষী কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড় নামের কুমির দুটি মারা যায়। ২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের মাদরাজের একটি পুরুষ কুমিরের আক্রমণে কালা পাহাড় (পুরুষ) নামে একটি কুমিরের মৃত্যু হয়। আর ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ধলা পাহাড়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হযরত খান জাহান (র:) এর মাজারের দিঘিতে ছয়শ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকা মিঠাপানির কুমির যুগল কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড়ের ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে।

২০২১ সালের ১২ জুন পুরুষ বড় কুমিরটি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজননকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির ও স্থানীয় খাদেমদের সহায়তায় কুমিরটিকে ওপরে তোলা হয়েছিল। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে কুমিরটিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে মোটামুটি সুস্থ ছিল পুরুষ কুমিরটি। স্থানীয় ফকিরদের দাবি, কুমিরের একটি চোখ অন্ধ ছিল। ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পুরুষ (বড়) কুমিরটির মারা যায়।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এই দিঘিতে কুমিরের বিচরণ অব্যাহত রাখার জন্য ২০০৪ সালের ২৬ জুন ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি কুমির এনে চারটি এখানে অবমুক্ত করা হয়। এর মধ্যে দিঘির পাড়ের অসাধু ব্যক্তিদের অত্যাচারে তিনটি মারা যায়। বেঁচে থাকা কুমিরটি সঙ্গী খুঁজতে লোকালয়ে চলে যায়। একবার নয়, আনুমানিক ৯০ বার দিঘির কুমিরটি লোকালয়ে যায়। সবশেষ ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে আধা কিলোমিটার দূরে খোন্দকার বাড়ির পুকুরে চলে যায়। এরপর খাদেমরা খবর পেয়ে কুমিরটি উদ্ধার করে পুনরায় দিঘিতে ছেড়ে দেন।

এদিকে, প্রাকৃতিকভাবে কুমির হিংস্র প্রজাতির প্রাণী হলেও দরগার আগের কুমির ছিল এর বিপরীত। দর্শনার্থীরা গায়ে হাত বুলিয়ে অনেক সময়ে নিজ হাতে মুখের মধ্যে খাদ্য ঢুকিয়ে দিলেও কুমির কখনও হিংস্রতা দেখায়নি। এ কারণে দেশ-বিদেশের অনেক দর্শনার্থী মাজার জিয়ারত শেষে দিঘির কুমির দেখে ও স্পর্শ করে মুগ্ধ হতেন।

খানজাহান আলী (রহ.) মাজার দিঘির খাদেম ফকির জামাল হোসেন বলেন, “বংশ পরম্পরায় এখানে কুমির ছিল। পরে ছাড়া হলেও একটিমাত্র কুমির দিঘিতে আছে। সঙ্গী না থাকায় সে লোকালয়ে চলে যেত। দ্রুত নতুন কুমির ছাড়ার দাবি ছিল। কিন্তু কুমিরটি ইতোমধ্যে দুটি প্রাণ হত্যা করেছে। এ অবস্থায় সেটি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছে। দিঘির ঐতিহ্য কুমির না থাকলে দর্শনার্থীরা হতাশ হতে পারেন।”

   

About

Popular Links

x