Thursday, June 18, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বরেন্দ্র অঞ্চলে তীব্র পানি সংকট, মরুকরণের ঝুঁকি

এলাকায় ৫টি জেলার প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি পানির সংকটে ভুগছেন

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:২১ পিএম

বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃহত্তর অংশজুড়ে তীব্র পানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিগত কয়েক দশকে জলবায়ুর আমূল পরিবর্তনের প্রভাবে এই অঞ্চলে বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও জয়পুরহাটের কিছু এলাকায় এই সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ায়, ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, কম বৃষ্টিপাতের কারণে তীব্র পানিসংকট ও মরুকরণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

সেইসঙ্গে জলবায়ুর আমূল পরিবর্তনের ফলে কৃষিজমি ও জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। এতে করে বদলে গেছে এ অঞ্চলের জীবন ও জীবিকা। গভীর নলকূপ দিয়েও পানি পাওয়া যাচ্ছে না, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি পানির সংকটে ভুগছেন।

এই পরিস্থিতিতে সরকার ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ পাঁচটি জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজা ও সাড়ে পাঁচ হাজার গ্রামকে বর্তমানে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পানিসংকট এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে।

এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৫০৩টি মৌজাকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত বছর ৬ নভেম্বর সরকার পানি সংকটের ঝুঁকির কথা বিবেচনায় এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করেছে। সরকারি গেজেটে শুধু খাওয়ার পানি ছাড়া ১০ বছরের জন্য অন্য কোনো কাজে এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করেছে।

২০১৩ সালের পানি আইন অনুযায়ী এই এলাকায় খাবারের পানি ছাড়া সেচ কিংবা শিল্পকারখানায় আর গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করা যাবে না। এ আদেশ লঙ্ঘনকারীকে ‘পানি আইন ২০১৩’ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি পানির সংকটে ভুগছেন। এতে প্রচণ্ড চাপে পড়েছে কৃষি ও ব্যবসা। এসব জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন, পানীয় জলের প্রাপ্যতা ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) গবেষণা অনুসারে, ১৯৮০ সালে পানির স্তর মাত্র ৩৯ ফুট নিচে ছিল। ২০১৬ সালে ১১৮ ফুট নিচে নেমে গেছে। এ এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে পাতলা একটা পানির স্তর পাওয়া যাচ্ছে। এ পানি হস্তচালিত বা গভীর নলকূপে উঠছে না।

গত এক দশকে বৃষ্টির পরিমাণ একেবারেই কম। বছরের ৭ থেকে ৯ মাসই থাকে বৃষ্টিহীন। এখন পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে যত প্রাকৃতিক সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া। বিগত ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হ্রাসের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বার্ষিক বৃষ্টিপাত কমেছে ৩.৭৪ থেকে ৬ মিলিমিটার হারে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে গত দুই দশকে।

গবেষকরা বলছেন, বরেন্দ্র এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি এত বেশি উত্তোলন করা হয়েছে, যার কারণে কিছু কিছু স্থানে পানির স্তর এতটাই নেমে গেছে যে গভীর নলকূপ ব্যবহার করেও ভূগর্ভস্থ পানি মিলছে না। পানির দুষ্প্রাপ্যতায় বিভিন্ন এলাকায় ফসলের আবাদ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। তা ছাড়া খাবার পানি মেলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে এই এলাকার মানুষের। এমনকি পানি নিয়ে প্রায়ই সংঘাত-মারামারির ঘটনা ঘটছে। পানি না পেয়ে এলাকা ছেড়েছে অনেকে।

তথ্যমতে, ১৯৮৫ সাল থেকে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এ অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে কৃষকদের সরবরাহ শুরু করে। এ সময় বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে) বিএমডিএ প্রায় ১৮ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করে। এরপরও অত্র অঞ্চলের সমগ্র কৃষিজমিতে সেচ-সুবিধায় আনতে বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ সফল হয়নি। বিএমডিএর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেক সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি পানি বাণিজ্যের জন্য এক শ্রেণির অসাধু গোষ্ঠী ব্যাপকহারে বেসরকারিভাবে সাব-মার্সিবল পাম্প স্থাপন শুরু করে। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ব্যাপকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে কৃষিকাজের জন্য আর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. আবুল কাশেম বলেন, “বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃক্ষরোপণ করায় গরমের প্রভাব অনেকটা কমে সহনীয় মাত্রায় এসেছে। আগে এখানে বৃষ্টি কম হতো, গাছপালা বেশি থাকায় এখন বৃষ্টির পরিমাণও আগের তুলনায় বেড়েছে। সময়ের সঙ্গে মিল রেখে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় খরা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি হচ্ছে। প্রাকৃতিক এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।”

বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চল সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “উন্নয়ন করতে গিয়ে যতো পরিবেশ ধ্বংস, প্রাণপ্রতিবেশ বিনষ্ট করা হচ্ছে, ততোই কৃষিপ্রতিবেশ চর্চা সংকটের মধ্যে পড়ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সমস্যা সমাধানে যতো আইন তৈরি হয়েছে। সেগুলো অনেকটাই কৃষকবান্ধব নয় এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের ভৌগোলিক এবং ঐতিহ্যকে পূর্ণাঙ্গরুপে সমর্থন করে না। আইন এবং নীতিমালা শুধু কৃষকদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট মোকাবিলায় দ্রুত ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হবে। কারণ বরেন্দ্র অঞ্চল উচু এলাকায়। তাই খাঁড়ি ও পুকুরগুলো খনন-পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি ধারণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। সেখান থেকে পানি নিচের দিকে চলে আসতে পারে। এজন্য খাঁড়িতে ‘ক্রসডেম’ দিয়ে পানি ধরে রাখতে হবে। বর্ষা মৌসুমে যে আমন ধান হয়, তখন খরাও হয়। যতটা সম্ভব এই খরা মোকাবিলা করতে হবে নদীর পানি দিয়ে। আর বোরো ধানের শুরুটা পুকুর ও খাঁড়ির পানি দিয়ে করতে হবে। তারপর সংকট অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে হবে। কখনোই নির্বিচার ভূগর্ভস্থ পানি তোলা যাবে না। এছাড়াও বৃষ্টির পানি ফিল্টার করে মাটির নিচে পাঠাতে হবে। ভূ-উপরিস্থ পানির যত রকম উৎস আছে, সব কটি কাজে লাগাতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে, কোনোভাবেই যেন ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় না হয়।

   

About

Popular Links

x