Sunday, August 16, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পদ্মার বুকে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’, দর্শনার্থীদের ভিড়

পদ্মার বুকে জেগে ওঠা একটি চর, যার আদি নাম চরখিদিরপুর

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

নদীর বুকে মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি। কখনো রোদ, কখনো ছায়া, কখনো আবার হালকা বৃষ্টি। প্রকৃতির এমন খেয়ালি রূপের মধ্যেই বেলা সাড়ে ১১টায় দেখা মেলে পদ্মা নদীর ডগারঘাটের। ঘাটে সারি সারি বাঁধা নৌকা কোনোটি ছাড়ছে, কোনোটি ছাড়বে, কোনোটি আবার সবেমাত্র ফিরেছে। এই ব্যস্ততার নেপথ্যে পদ্মার বুকে জেগে ওঠা একটি চর, যার আদি নাম “চরখিদিরপুর”। নদীর মাঝে অবস্থানের কারণে যা এখন পরিচিত “মিডিল চর” নামে।

চরটি ঘিরে রয়েছে পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশি। জেগে ওঠা বালুচর ঢেকে গেছে সবুজ ঘাসে, যেখানে দিনভর চরে বেড়ায় গবাদিপশু। ছোট ছোট খড়ের ঘরে বসবাসকারী মানুষদের প্রধান পেশা কৃষি ও পশুপালন। এই সবুজ আর পশুচারণের দৃশ্যই চরটিকে এনে দিয়েছে “মিনি সুইজারল্যান্ড” নাম।

নৌকায় প্রায় আধা ঘণ্টার যাত্রায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া দর্শনার্থীদের পাশাপাশি ছিলেন চরের বাসিন্দারাও। তাদেরই একজন, ৫৩ বছর বয়সী আবদুস সাত্তার। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “পদ্মায় এখন যে পানি আছে তা তার প্রকৃত যৌবনের তুলনায় কিছুই নয় একসময় ঢেউয়ের গর্জন আর জেলের জালে ইলিশ ওঠা ছিল নিত্যদিনের চিত্র, যা এখন অতীত।”

মিডিল চরে পৌঁছানোর আগে চোখে পড়ে সদ্য গড়ে ওঠা কিছু অস্থায়ী দোকান পানি, ফুচকা, বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে সেখানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি-ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর হঠাৎ করেই বেড়েছে এই স্থানের জনপ্রিয়তা।

নদী পার হয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছাতে হয় মূল চরে, যেখানে একটি মসজিদ ও চরখিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষকদের ভাষ্যে, নদীর পানি বাড়ায় স্কুলে যাতায়াতের পথ কঠিন হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমেছে।

চরের ঘরগুলো টিন ও নলখাগড়ায় তৈরি, নেই পাকা রাস্তা শুধু বালু উঁচু করে তৈরি চলাচলের পথ। প্রতিটি বাড়ির সামনে থাকে গরু, ভেড়া, ছাগল ও মহিষের বাথান, যেখানে প্রতি পালে থাকে ৮০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত পশু। এখানকার দুধ বিক্রি হয় রাজশাহী শহরের হোটেলগুলোতে, নদীর বাঁধে বসেই বিক্রি হয় প্রতি লিটার ৭০-৮০ টাকায়। চরের দক্ষিণে চলছে পাটজাগ ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ।

সাদা বালুর সঙ্গে কাশফুলের শুভ্রতা, নীল আকাশ আর মেঘের ভেলা মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক ছবির মতো দৃশ্য। পবা উপজেলার এই চর এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে নতুন আকর্ষণ। ঋতুভেদে বদলে যায় এর রূপ বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর, শীত-শরতে কাশফুলে ছাওয়া, গ্রীষ্মে বিস্তীর্ণ বালুচর। বিকেলের শেষ আলোয় নদীর পানিতে যখন সূর্যের প্রতিচ্ছবি পড়ে, তখন পুরো চরে নামে মোহনীয় আবহ।

স্থানীয়দের কাছে আগে থেকে পরিচিত হলেও ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়া ছবি-রিলসের মাধ্যমে এখন এই চর পরিচিতি পাচ্ছে সারা দেশে। “রাজশাহীর মিনি সুইজারল্যান্ড” নামটি কোনো সরকারি স্বীকৃতি নয়, বরং মুগ্ধ দর্শনার্থীদের দেওয়া উপমা তবে এই নামেই এখন চরটি আলোচনায়।

মদিনাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোবাসের জানান, ভিডিওতে দেখে আগ্রহী হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন, মাঠে ফুটবল খেলেছেন, নদীতে গোসল করেছেন। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান সাত বান্ধবী নিয়ে এসে বলেন, “এত বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা আগে দেখেননি।”

শহর থেকে মাত্র এক-দুই ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় এই চরে। নেই যানজট বা কোলাহল, আছে শুধু নদীর বাতাস আর খোলা আকাশ। বালুর ওপর হাঁটা, সূর্যাস্ত দেখা কিংবা নৌকায় ঘুরে বেড়ানো প্রতিটিতেই মেলে ভিন্ন অনুভূতি।

চরে ভ্রমণে সতর্কতা জরুরি কোথাও বালুচর নরম, কোথাও গভীর গর্ত থাকতে পারে। এ কারণে লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের নির্দেশনায় মাঝিদের মধ্যে লাইফ জ্যাকেট বিতরণ করা হয়। নৌ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং ছাড়া নৌকা না ছাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নৌকার মাঝি সুজন আলী বলেন, “দুই সপ্তাহ আগেও ঘাটে মাঝিরা অলস সময় কাটাতাম, এখন দর্শনার্থীর ভিড়ে আয় বেড়েছে।” স্থানীয় ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে চরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন থাকে।

পরিকল্পিতভাবে এগোলে মিডিল চর রাজশাহীর পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

   

About

Popular Links

x