চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জান্নাত (২০)। কলেজে হোস্টেলের সিট বরাদ্দ দেওয়া হবে, তাই নোটিশ মেনে অভিভাবক হিসেবে রাঙ্গুনিয়া থেকে রওনা দিয়েছিলেন বাবা আরিফুর রহমান। আর কক্সবাজারের চকরিয়ায় নানাবাড়ি থেকে বাসে চেপে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল মেয়ে সুমাইয়া। মেয়ে কত দূর এসেছে জানতে বাবা যখন মুঠোফোনে কল করলেন, ওপাশ থেকে এক অচেনা তরুণ ভারী গলায় বললেন, ‘‘মুঠোফোনের মালিক আর বেঁচে নেই।’’
মঙ্গলবার (২৩ জুন) চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি বাজার এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান কলেজছাত্রী সুমাইয়া।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন পেশায় মসজিদের ইমাম আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, “বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও সুমাইয়ার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। আমার মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি অসুস্থ মানুষ, এই শোক কীভাবে বইব? মেয়ে স্বপ্ন দেখত, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি নিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াবে, কিন্তু মেয়েটিই এখন নেই।”
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়ের লাশের সামনে আহাজারি করছিলেন মা ইয়াছমিন আক্তার। কান্না করতে করতে তিনি বলছিলেন, “হোস্টেলে সিট বরাদ্দের জন্য ওর বাবা রাঙ্গুনিয়া থেকে কলেজে আসছিলেন। তিনি অপেক্ষা করবেন বলে মেয়েটি সকাল সাতটায় ভাত খেয়ে তাড়াহুড়া করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় বলেছিলাম, এত তাড়া কিসের? পাঁচ মিনিট পর বের হও, কিন্তু মেয়ে কথা শোনেনি। পাঁচ মিনিট পর বের হলে হয়তো আমার মেয়েটা বেঁচে যেত।”
নিহত সুমাইয়ার আদি বাড়ি বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের আরব শাহ ঘোনাপাড়া জমিদারবাড়ি এলাকায়। তবে মা ও ভাইবোনদের নিয়ে সুমাইয়ারা থাকতেন চকরিয়া উপজেলার মালুমঘাট এলাকায় নানার বাড়িতে। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সুমাইয়া সবার বড় ছিলেন।
হাইওয়ে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, লোহাগাড়ার চুনতি বাজার এলাকায় কক্সবাজারগামী ইম্পিরিয়াল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রামগামী পূরবী পরিবহনের অন্য একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় বাসের সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায় এবং কয়েকজন যাত্রী আহত হন।
গুরুতর আহত সুমাইয়া জান্নাতকে লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহ উদ্দিন চৌধুরী জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত বাস দুটি জব্দ করেছে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই কলেজছাত্রীর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই দুই বাসের চালক পালিয়ে গেছে; তবে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।



