Monday, June 29, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

তুরাগ থেকে ৪ মরদেহ উদ্ধার: স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে যা জানা গেলো

তুরাগ নদ থেকে অন্তত চারজনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে জানা গেছে

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৫:১১ পিএম

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২২ জুন  দলটির সাত নেতাকর্মীর লাশ ভাসার যে খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, তা ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে পুলিশ। 

তবে এই সূত্র ধরে তুরাগ নদ সংলগ্ন এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক থানা এবং নৌ-পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে গেল ২২ জুন থেকে শনিবার (২৭ জুন) পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে অন্তত চারজনের মরদেহ উদ্ধারের সত্যতা পেয়েছে এ প্রতিবেদক। 
 

ঘটনাস্থলে উপস্থিত দলটির এক কর্মীর পরিবারের সদস্য এবং দুই প্রত্যক্ষদর্শী, ২২ জুন পুলিশের ধাওয়ায় কয়েকজনের নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া ও সেখান থেকে নিখোঁজের বিষয়টি এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন। 

পুলিশের দুই মামলায় দুই বিবরণী

এদিকে, তুরাগে পাওয়া  মরদেহগুলো উদ্ধারের ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। এরমধ্যে একটি অপমৃত্যু মামলা, অপরটি ২২ জুনের অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা। দুটি মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে পৃথক বিবরণ। 

২২ জুনের তারিখ উল্লেখ করে একটি মামলার বিবরণীতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের কর্মীদের অবস্থান জানতে পেরে সাতজনকে আটক করা হয়।

অন্যদিকে, একই দিনে নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ উদ্ধারের অপমৃত্যু মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ বলছে, নৌকা ভ্রমণে গিয়ে অসাবধানতাবশত কিশোর সুমনসহ কয়েকজন পানিতে পড়ে যায়। এ সময় সাঁতার না জানায় সে ডুবে যায়। পরবর্তীতে ২৬ জুন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

গত ২৬ জুন দিবাগত রাতে তুরাগের রানাভোলা এলাকার মো. রানা মিয়ার ছেলে মো. সুমনের (১৭) মরদেহ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। আশুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) মাহবুবুর রহমান বলেন, “শুক্রবার দিবাগত রাতে তুরাগ নদের আশুলিয়া গরুর হাট-সংলগ্ন নৌকা ঘাট থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভাটিতে ভাসমান অবস্থায় সুমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।”

এছাড়া একই দিন (২৪ জুন) সকালের দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটনের (ডিএমপি) দারুসসালাম থানাধীন তুরাগ নদ রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আমিনবাজার নৌ-থানার ওসি হুমায়ুন কবির বলেন, “২৪ জুন সকালে দারুসসালাম থানাধীন তুরাগ নদ থেকে রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ২২ জুন থেকে নিখোঁজ ছিলেন।”

এই দুজনই গেল ২২ জুন থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে পরিবারের সূত্রে জানা যায়। এ দুজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে দাবি করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।

নিহত মো. সুমনের স্বজন জুয়েল রানা বলেন, “২২ তারিখে সুমন ছাত্রলীগের একটি মিছিলে গিয়েছিলো। মিছিলটি কামারপাড়া থেকে রসুলপুর ঘাট পর্যন্ত যায়। পরে তারা সেখান থেকে একটি ট্রলার ভাড়া করে আশুলিয়া ঘাটের দিকে যায়। আশুলিয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর পুলিশ তাদের ওপর অভিযান চালায়। তখন সাতজনকে আটক করা হয়। আর বাকিরা নদীতে ঝাঁপ দেয়। সুমনও তখন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল বলে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি।”

মৃত আরিফ হাসান রাকিবের চাচা আসাদুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। সে আওয়ামী লীগের মিছিল করতো শুনেছি। যা ঘটেছে ফেসবুকেই দেখেছেন।”

অন্যদিকে, ২৬ জুন দুপুরের দিকে রনি মোল্ল্যা নামে আরেকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তিনি উত্তরা দিয়াবাড়ি ঘাটে কয়েকজনের সঙ্গে গোসলে নেমে ডুবে যান। ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর তাকে মৃত অবস্থায় পাড়ে তোলা হয়। ওই ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। রনির বাবা কফিল উদ্দিন জানান, “গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে রনির মৃত্যু হয়েছে।”

আর শনিবার নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া মারুফ হাসান (১৫) নামে আরেক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মারুফ হাসানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের ধাওয়ায় ঝাঁপ দিয়েছিল কয়েকজন, বলছেন মৃতের স্বজন-প্রত্যক্ষদর্শী

মরদেহ উদ্ধারের সবচেয়ে আলোচিত নামটি মো. সুমনের (১৭)। সেদিন ট্রলারে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন নেতা-কর্মী পরবর্তীতে যোগাযোগ করেছে মো. সুমনের পরিবারের সঙ্গে। তার নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘটনা তাদের কাছ থেকেই জেনেছে তার পরিবার, তবে সেই সঙ্গীরা এখনও আত্মগোপনে।

কিশোর সুমনের খালু মো. জুয়েল বাবু জানান, ২২ জুন সুমন নিখোঁজ হওয়ার পর খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে ওই দিন (২২ জুন) সুমনের সঙ্গে ছিল এমন কয়েকজনের কাছ থেকে ঘটনা জানতে পেরেছেন।

তিনি বলেন, “সুমনের সঙ্গীরা জানিয়েছেন, সুমন ২২ জুন আওয়ামী লীগের একটি মিছিলে গিয়েছিল। মিছিল শেষে তুরাগ নদের রোস্তমপুর ঘাট থেকে একটা ট্রলার ভাড়া করে তারা। আশুলিয়া ট্রলার ঘাটে যান। সেখানে যাওয়ার পর পুলিশ ধাওয়া করে। সুমনসহ কয়েকজন পানিতে ঝাঁপ দেন। এ সময় ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

যারা তথ্য জানিয়েছে তারা সবাই এখন পলাতক উল্লেখ করে জুয়েল বাবু বলেন,“সুমন সাঁতার জানতো না। এর পর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। এরপর বিভিন্ন জায়গায় আমরা খোঁজাখুঁজি করি। একবার শুনতে পেয়েছিলাম সুমনকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। পরে নিশ্চিত হই সে অ্যারেস্ট হয়নি।”

জুয়েল বাবু আরো বলেন,  “আমরা ট্রলার নিয়ে তুরাগের বিভিন্ন এলাকা খোঁজাখুঁজি করেছি। তুরাগ ও আশুলিয়া থানা–পুলিশের কাছে গিয়েছি। পুলিশ আমাদের ঘটনার বিষয়ে কিছুই বলে নাই। ২৩, ২৪, ২৫ আমরা তিন দিন ট্রলার নিয়ে খুঁজছি। ২৫ তারিখ রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ আমাদের জানায়, জেলেরা নাকি একটা মরদেহ ভাসতে দেখেছে। লাশ উদ্ধারের পর আমরা সেটি সুমনের লাশ বলে নিশ্চিত হই।”

ঘটনাস্থল আশুলিয়া বাজারের বাঁশপট্টি এলাকায় গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। এরমধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বলেন, “সেদিন পুলিশ এই দিক দিয়েই যায়। পুলিশ দেখে ওরা ঝাঁপ দেয়। তখন পুলিশ ওদের তাড়া করে। আমরা তখন দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম আনুমানিক বেলা সোয়া ২টার দিকে। দেখলাম, ৫-৭ জন দৌড় দিয়েছে। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,বললো মিছিলে গিয়েছিল। সেখান থেকে ট্রলারের কাছে আসতেই পুলিশ তাড়া করেছে।”

তবে ঠিক কতজন ঝাঁপ দিয়েছিল তা নিশ্চিত বলতে না পারলেও তিনি বলেন, “কয়জন ঝাঁপ দিয়েছিল বলতে পারব না। তিনজনকে উঠতে দেখেছি। পুলিশ সম্ভবত সাতজনকে আটক করেছিল। এখানে কাউকে কিছু বলেনি। পরে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নিয়ে গেছে।”

পাশেই বসে থাকা আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর পুলিশ ওই ট্রলার নিয়ে কিছু দূর গিয়েছিল, পরে ফেরত আসে।

অভিযানে গ্রেপ্তার ও অপমৃত্যুতে পৃথক মামলা, ভিন্ন বর্ণনা

গেল ২২ জুন আশুলিয়া ট্রলার ঘাটে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাতজনকে আটকের তথ্য উল্লেখ করে পর দিন আশুলিয়া থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়। সেখানে দিন ২২ জুন ও আশুলিয়া গরুর হাট ট্রলার ঘাট স্থান দেখানো হয়।

এছাড়া পরবর্তীতে ২৬ জুন মো. সুমনের মরদেহ উদ্ধার হলে সেই ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়, এই মামলায়ও ২২ জুন বিকেল ও আশুলিয়া গরুর হাট ট্রলার ঘাট স্থান দেখানো হয়।

দিন ও ঘটনাস্থল একই হলেও মামলার ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয় ভিন্ন।

২২ জুন আশুলিয়া থানায় করা মামলায় এজহারে বলা হয়, ২২ জুন বেলা ৩টার দিকে আশুলিয়া থানার আশুলিয়া গরুর হাটের পাশে ট্রলার ঘাটের ওপর আওয়ামী লীগ এবং দলটির সহযোগী অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ৬০–৬৫ জন নেতা–কর্মী দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, এলাকার জনগণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং দেশের অভ্যন্তরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছে বলে জানতে পারে পুলিশ। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের প্রতিহত করে। পুলিশের বাধা পেয়ে আন্দোলনকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় সাতজন আটক হন।

অন্যদিকে ২৬ জুন মো. সুমনের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বড় ভাই মো. সালাউদ্দিন অপমৃত্যুর মামলা করেন। ওই মামলার এজহারে বলা হয়, ২২ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বন্ধুবান্ধবসহ ২০–২২ জন তুরাগ নদে নৌকা ভ্রমণের উদ্দেশে ধৌড় ব্রিজ ঘাট এলাকায় নৌকায় ওঠে মো. সুমন (১৭)। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আশুলিয়া গরুর হাট ঘাটে তাড়াহুড়া করে নৌকা থেকে নামতে গিয়ে অসাবধানতাবশত সুমনসহ ৫–৬ জন নদীতে পড়ে যায়। সে সাঁতার জানত না। সাঁতার না জানার কারণে নদীতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নদীর স্রোতে নদীতে ডুবে যায়। তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে সুমনকে পায়নি। বিষয়টি সুমনের বন্ধুবান্ধবরা তাকে জানান। পরে ২৬ জুন নদ থেকে ভাসমান অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়।

২২ জুন আশুলিয়া থানায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলাটির আসামিদের আইনজীবী আরিফ সরকার পাভেল। তিনি বলেন, “সুমনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া অপমৃত্যুর মামলা এবং গ্রেপ্তার ৭ জনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার ঘটনার স্থান, সময় প্রায় একই।”

তিনি বলেন, “আসামিদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তারা ২ জুন মিছিল করে। তুরাগ এলাকায় মিছিলের সময় তুরাগ থানা–পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীরা ধাওয়া দিলে ট্রলারে করে তারা আশুলিয়া ট্রলার ঘাটে যায়।”

তিনি আরো বলেন, “পুলিশ ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা সেখানে গিয়ে তাদের ওপর হামলা করলে অনেকে নদীতে লাফ দেয়। নদীতে লাফিয়ে পড়াদের লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। সেখান থেকে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।”

   

About

Popular Links

x