দেশের তৃতীয় বৃহত্তর মধুপুর গড়। এ বনের ভেতরে দিয়ে চলে গেছে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট বড় যানবাহন চলাচল করে। বনের প্রাণীরা তাদের আবাসস্থল থেকে খাবারের সন্ধানে সড়ক পারাপার হতে যেয়ে যানবাহনের চাকায় পৃষ্ঠ হয়ে প্রাণ হারায়।
এমন পরিস্থিতিতে বনবিভাগ তাদের শালবন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের মাধ্যমে বানর, হনুমানের মতো প্রাণীদের সুবিধার্থে কয়েকটি বনাঞ্চলটির কয়েকটি স্থানে ৫ টি রোপওয়ে বা উড়াল সেতু তৈরি করে দিয়েছে।
বনবিভাগ মনে করছে. রোপওয়ে তৈরির ফলে বন্যপ্রাণী নিরাপদে সড়ক পারাপার হতে পারবে, আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনাও হ্রাস পাবে।
বনবিভাগ জানায়, মধুপুরের বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কটি পড়ায়, খাবারের সন্ধানে রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনায় বানর, হনুমান, মেছোবিড়াল, গন্ধগোকুলসহ বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যু হয়। এসব মৃত্যু ঠেকাতে মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জ এলাকায় টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাঁচটি স্থানে রোপওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই গাড়ি চলাচল করে। বনের এখানে পর্যটক ও পথচারীদের দেওয়া খাবারের আশায় প্রায়ই বানর-হনুমান মহাসড়কে নেমে আসে। এতে প্রায়ই বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এখন থেকে রোপওয়ের ব্যবহার বাড়লে এ ধরনের মৃত্যু কমবে বলে মনে করছে তারা।
জানা যায়, একসময় প্রায় ৬২ হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত মধুপুর বনাঞ্চলের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে উজাড় হয়ে গেছে। বন উজাড়, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং খাদ্যসংকটের কারণে বহু বন্যপ্রাণী অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, রোপওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি বন সংরক্ষণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে মধুপুরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল বাস মিনিবাস মালিক সমিতির আহবায়ক শফিকুল ইসলাম বলেন , “এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টাই গাড়ি চলাচল করে। বনের এখানে পর্যটক ও পথচারীদের দেওয়া খাবারের আশায় প্রায়ই বানর-হনুমান মহাসড়কে নেমে আসে। এতে হঠাৎই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এখন থেকে রোপওয়ের ব্যবহার বাড়লে এ ধরনের মৃত্যু কমবে বলে আশা করি।”
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বলেন, “মধুপুর বনাঞ্চলের দুর্লভ মুখপোড়া হনুমান উঁচু গাছে বিচরণ করে এবং খাবারের সন্ধানে এক গাছ থেকে অন্য গাছে চলাচল করে। বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে থাকা উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎলাইন তাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে প্রাণীগুলোর মৃত্যু কমবে এবং প্রজননও স্বাভাবিক থাকবে। পরিবেশও ভালো থাকবে।”
সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব বলেন, “রোপওয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচল, আবাসস্থলের বিভাজন রোধ এবং প্রজননে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া আমরা রোপওয়েগুলো বৈদ্যুতিক লাইন থেকে যথেষ্ট দূরে রাখার চেষ্টা করেছি। আশা করি পশুপাখিদের সমস্যা হবে না। ”
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহাম্মদ মহসীন বলেন, “বনাঞ্চলের এ অংশ দিয়ে রাস্তা পারাপারের সময় প্রায়ই বানর-হনুমান ও নিশাচর প্রাণী মারা যায়। ধীরগতিতে গাড়ি চালানোর জন্য সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও অনেক চালক তা মানেন না। তাই গাছে বিচরণকারী প্রাণীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য রোপওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।”



