Tuesday, July 21, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ইরানি কাউন্সিলর: সংস্কৃতি, ইতিহাস ও বিশ্বাসই ইরানের প্রতিরোধের ভিত্তি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের প্রতিরোধের পেছনে সামরিক শক্তির চেয়েও ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের সাংস্কৃতিক কাউন্সিলর

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের পরও ইরান যে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তার পেছনে কেবল সামরিক সক্ষমতা নয়, বরং দেশের দীর্ঘ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় বিশ্বাস সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের সাংস্কৃতিক কাউন্সিলর মাহদি মৌলায়ী আরানি।

সোমবার (২০ জুলাই) ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন কার্যালয় পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক অনেক সংবাদমাধ্যম যুদ্ধের সময় ইরানের জনগণের মধ্যে হতাশা ও ভীতির চিত্র তুলে ধরেছে, তবে বাস্তব পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।”

ঢাকা ট্রিবিউন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সম্পাদক রিয়াজ আহমদ এবং ইরানি সাংস্কৃতিক কাউন্সিলর দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও জোরদারে গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বৈঠকে জ্ঞান বিনিময়, সংবাদ ও গণমাধ্যম সহযোগিতা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পারস্পরিক প্রচার এবং দুই দেশের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরতে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে উভয়পক্ষ নীতিগতভাবে একমত হন। 

ইরানের বর্তমান সংকট নিয়ে আরানি বলেন, “ইতিহাসে খুব কমই এমন উদাহরণ পাওয়া যায়, যেখানে একটি দেশের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও গুরুত্বপূর্ণ নেতারা নিহত হওয়ার পরও সেই দেশ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।” 

তার ভাষ্য, সাধারণত যুদ্ধের সময় মানুষ দেশত্যাগ করে, সরকারি কর্মকর্তারা নিরাপদ স্থানে সরে যান কিংবা সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইরানে এমনটি ঘটেনি। বরং বিদেশে অবস্থানরত অনেক ইরানি দেশে ফিরে এসে সংহতি প্রকাশ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যেও অনেক শহরে মানুষ আতঙ্কে পালিয়ে না গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও উদ্ধারকর্মীদের সহযোগিতা করেছে।

‘সফট পাওয়ারই সবচেয়ে বড় শক্তি’

আরানি বলেন, “ইরানের শহীদ সর্বোচ্চ নেতা প্রায়ই দুটি শক্তির কথা বলতেন- হার্ড পাওয়ার ও সফট পাওয়ার। সামরিক শক্তি প্রয়োজনীয়, কিন্তু একটি জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখে তার সফট পাওয়ার, অর্থাৎ ইতিহাস, সংস্কৃতি, জাতীয় পরিচয় এবং মানুষের বিশ্বাস”।

তিনি বলেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরপেক্ষ ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও ইরান বিদেশি শক্তির দখলের শিকার হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশটি উপলব্ধি করে যে কেবল অস্ত্র দিয়ে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা যায় না।”

কাউন্সিলরের মতে, ইরানের জনগণের দৃঢ়তার অন্যতম ভিত্তি ধর্মীয় বিশ্বাস।

তিনি বলেন, “পবিত্র কোরআনে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা ইরানের মানুষের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত। সংখ্যায় কম হলেও সত্যের পক্ষে থাকা মানুষ শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে-এই বিশ্বাসই সংকটের সময় জনগণকে সাহস জুগিয়েছে।”

তিনি হযরত মুসা (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, “পৃথিবীর যেকোনো সামরিক শক্তির চেয়েও আল্লাহর শক্তির প্রতি বিশ্বাসকে ইরানিরা বড় বলে মনে করে।”
কাউন্সিলর বলেন, ইরানের নেতারা নিহত হওয়ার পরও জনগণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হয়নি।

“আমাদের বিশ্বাস, শহীদরা মৃত নন; তারা চিরঞ্জীব। এই বিশ্বাস মানুষকে আরও দৃঢ় করেছে,” বলেন তিনি।

ফেরদৌসী, শাহনামা ও জাতীয় পরিচয়

ইরানের জাতীয় ঐক্যের পেছনে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূমিকাও তুলে ধরেন ইরানি সাংস্কৃতিক কাউন্সিলর। তিনি বলেন, “আবুল কাসেম ফেরদৌসীর মহাকাব্য শাহনামা আজও ইরানের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”

ফেরদৌসীর একটি বিখ্যাত পঙ্‌ক্তির উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মূল বার্তা হলো-দেশের অস্তিত্ব না থাকলে ব্যক্তির অস্তিত্বেরও কোনো মূল্য নেই। এই ধরনের সাহিত্য ইরানিদের মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও জাতীয় ঐক্যের চেতনা গড়ে তুলেছে।

তিনি আরও বলেন, শাহনামা-র সঙ্গে বাংলাদেশেরও ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে।

‘ইরান যুদ্ধ নয়, মর্যাদাপূর্ণ শান্তি চায়’

ভবিষ্যতে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে ইরানি কাউন্সিলর বলেন, “ইরান যুদ্ধকে সমাধান হিসেবে দেখে না এবং সবসময় ন্যায়ভিত্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ শান্তির পক্ষে।”
তবে তিনি বলেন, “কোনো দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শান্তি টেকসই হতে পারে না।”

“আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের মর্যাদা। এই নীতির সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই,” বলেন তিনি। আলোচনার শেষ দিকে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, “ইরানের শক্তিকে শুধু সামরিক সক্ষমতার মাধ্যমে বিচার করলে পূর্ণ চিত্র বোঝা যাবে না।”

“আমাদের শক্তির বড় অংশ নিহিত রয়েছে মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে। যে জাতি নিজের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে, তাকে সহজে পরাজিত করা যায় না”। 

   

About

Popular Links

x